চট্টগ্রামকে মূল্যায়ন করতে চাইলে দরকার নগর সরকার
Date: 2026-01-13
সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘স্বাধীনতার আগে চট্টগ্রাম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল। তবে স্বাধীনতার পরে সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। ক্ষমতার কাছে না থাকলে সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা হয়। এ ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানীর রূপ দিতে চাইলে নগর সরকারের ধারণাকে শক্তিশালী করতে হবে। রেলপথ, নদীপথ ও সড়কপথের সমন্বয়ে গড়ে তুলতে হবে বহু স্তরের যোগাযোগ ব্যবস্থা। এতেই চট্টগ্রামে আরও লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে উঠবে।
‘চট্টগ্রাম কবে বাণিজ্যিক রাজধানী হবে’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
গতকাল রোববার দুপুরে নগরের একটি হোটেলে এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে দৈনিক প্রথম আলো। এতে আরও বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান। বৈঠকে রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি থেকে শুরু করে বিশিষ্টজন এ বিষয়ে নিজ নিজ মতামত তুলে ধরেন।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে কার্যকর করতে হলে দেশটাকে ডিরেগুলেট করতে হবে। যখন এটা করা হবে, তখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু কমে যাবে। ক্ষমতা ক্রমান্বয়ে বিকেন্দ্রীকরণ করলে স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হবে, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে। এতে আমলাতন্ত্রও দুর্বল হবে, দেশের মানুষ বেশি ক্ষমতায় থাকবে।
সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম ভৌগোলিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ শহর। ২০০৩ সালে যখন খালেদা জিয়ার সরকার ছিল, তখন চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে চিহ্নিত করে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা হয়েছিল। তবে পরে মাইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীন কিংবা আওয়ামী লীগ সরকার কেন জানি আর এগোয়নি। চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হোক, রাষ্ট্র আদৌ চায় কিনা– এটা বড় প্রশ্ন। চট্টগ্রামকে যদি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হয়, তাহলে নগর সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমার সঙ্গে যদি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সমন্বয় না থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে না। চট্টগ্রাম শহরের খালগুলোর দেখভালের কথা সিটি করপোরেশনের। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ২০১৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার এটা সংস্কারের জন্য সিডিএকে দিয়ে দিয়েছে। যতক্ষণ না রাষ্ট্র চট্টগ্রামকে ধারণ না করবে, ততক্ষণ চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হবে না।
প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ১৯৯২ সালে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে এগিয়ে নিতে কাজ করা হবে বলে জানিয়েছিলেন। পরে ২০০৩ সালের ৬ জানুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে উন্নয়নের জন্য ১৬ পয়েন্ট যুক্ত কর্মসূচি প্রস্তাব করা হয়েছিল। এরপর থেকে বিভিন্ন বৈঠক-আলোচনায় বিষয়টি উঠে এলেও বাস্তবায়নের দিকে এগোয়নি।
তিনি আরও বলেন, প্রায় ১৫ বছর আগে আমরা বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের সঙ্গে দ্বিতীয় রাজধানী চট্টগ্রামের বিষয়ে একটা আলোচনা করেছিলাম। চেম্বারের প্রতিনিধিরা আমাদের কাছে দাবি করলেন, এ ব্যাপারে একটা উদ্যোগ নিতে এবং নির্বাচনের আগে বিষয়টি যেন সামনে থাকে। সেটি মাথায় রেখেই আজকের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ব্যবসায়ী মহল থেকেও একই দাবি ছিল।
পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সাধারণ সম্পাদক স্থপতি জেরিনা হোসেন বলেন, নগর উন্নয়নের জন্য পেশাগত দক্ষতা, দায়বদ্ধতা, সৃজনশীলতা ও দূরদৃষ্টি দরকার। বাণিজ্যিক রাজধানী করতে হলে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি জরুরি।
এলপিজি অপারেটস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এবং সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, নদীবন্দর যতক্ষণ ব্যবহার করতে পারব না, ততক্ষণ এই পরিবেশ বাঁচবে না। ১০ ভাগের এক ভাগ খরচে নদীপথে পণ্য পরিবহন করা যায়। এর মানে হলো, সড়কে করতে গেলে আমরা যদি ১০ ভাগ দূষণ করি, নদী দিয়ে করতে গেলে তা এক ভাগে নেমে আসবে। বাণিজ্যিক রাজধানী করতে হলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্ব দিতে হবে।
জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল বলেন, সমন্বয় করা গেলে চট্টগ্রামকে সাজানোর বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। একসময় চট্টগ্রাম টু চিয়াংমাই টু ব্যাংককের যে ফ্লাইটটি ছিল, সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। সেটি আবার সপ্তাহে এক দিনের জন্য ফিরিয়ে আনা গেলে আমাদের জন্য অনেক উপকারী। তখন বিদেশি বায়াররা চট্টগ্রামে এসে আবার এক দিনেই ফিরে যেতে পারবেন।
টিকে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার বলেন, দীর্ঘদিন নিজেদের বাজার ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকে ঢাকাকেন্দ্রিক করে গড়ে তোলা এবং প্রশাসনিক সুবিধার কারণে প্রায় সব সরকারি দপ্তর ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে।
প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক বিশ্বজিৎ চৌধুরীর সঞ্চালনায় বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. সেলিম রহমান, আবুল খায়ের গ্রুপের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড লিগ্যাল শেখ শাবাব আহমেদ, প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক তুনাজ্জিন সুলতানা, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষক অনুপম দাশগুপ্ত, চট্টগ্রাম বন্দর পর্ষদের সাবেক সদস্য জাফর আলম, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান প্রমুখ।

