বাদুড়ের ছড়ানো রিওভাইরাসে মস্তিষ্কে প্রদাহ ও শ্বাসকষ্ট

Date: 2026-01-13
news-banner

দেশে বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়ানো আরেকটি নতুন ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এটির নাম রিওভাইরাস (অর্থোরিওভাইরাস)। এতে আক্রান্ত হলে মানুষের তীব্র শ্বাসকষ্ট ও মস্তিষ্কে প্রদাহজনিত জটিলতা দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইলম্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের সঙ্গে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে পাঁচজনের শরীরে এই ভাইরাসের অস্তিস্ত্ব পাওয়া গেছে, যাদের একজন মারা গেছেন। গবেষণা প্রতিবেদনটি যুক্তরাষ্ট্রের সংক্রামক রোগবিষয়ক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ইমার্জিং ইনফেকশাস ডিজিজেসে প্রকাশিত হয়েছে গত ডিসেম্বরে। গবেষণার  নেতৃত্ব  দেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইনফেকশন অ্যান্ড ইমিউনিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. নিশয় মিশ্র। 

বাংলাদেশে এই প্রথম বাদুড়-উৎপত্তিজনিত অর্থোরিওভাইরাসে মানুষের শ্বাসতন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হওয়ার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মিলল, যেটি রিও ভিরিডি গোত্রীয়। এই গবেষণায় রোগীর নমুনা বিশ্লেষণে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ভিরক্যাপসেক-ভার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। 

ভিরক্যাপসেক-ভার্ট প্রযুক্তি একসঙ্গে হাজারো ভাইরাস শনাক্ত করতে সক্ষম। এটি প্রচলিত পিসিআর পরীক্ষার চেয়েও সংবেদনশীল। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রায় সম্পূর্ণ ভাইরাস জিনোম বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে। গবেষণায় রোগীর শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে রোগীর নমুনা থেকে ভাইরাস কালচারও সফলভাবে করা হয়েছে।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত রোগীরা ২০২২ ও ২০২৩ সালে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তাদের উপসর্গ ছিল নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের মতো জ্বর, বমি, মাথাব্যথা, দুর্বলতা, অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ, শ্বাসকষ্ট ও স্নায়বিক জটিলতা। তবে পরীক্ষায় তাদের কারও শরীরেই নিপাহ ভাইরাস পাওয়া যায়নি।

গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত পাঁচজনই অসুস্থ হওয়ার আগে কাঁচা খেজুরের রস পান করেছিলেন। শীত মৌসুমে কাঁচা খেজুরের রস বাদুড়ের প্রিয় খাদ্য। এই রসের মাধ্যমেই নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে। বাদুড় ইতোমধ্যে নিপাহ, ইবোলা, রেবিস, হেন্ড্রা, মারবার্গ, সার্সসহ একাধিক প্রাণঘাতী ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক হিসেবে পরিচিত। নতুন করে সেই তালিকায় যুক্ত হলো রিওভাইরাস। গবেষণায় পদ্মা নদীর আশপাশের বাদুড় এবং ওই এলাকার মানুষের শরীরে এই ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে।

প্রধান গবেষক ড. নিশয় মিশ্র বলেন, আমাদের গবেষণা প্রমাণ করে, কাঁচা খেজুরের রস পান করার মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাস ছাড়াও প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রমিত রিওভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে। বাদুড়বাহিত ভাইরাস শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে বিস্তৃত সমন্বিত নজরদারি  জরুরি।

এর আগেও ড. নিশয় মিশ্রের নেতৃত্বে একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অঙ্গ প্রতিস্থাপন রোগী, কভিড-১৯ আক্রান্ত শিশুর স্নায়বিক জটিলতা, বিরল স্নায়ুরোগে এন্টারোভাইরাস এবং ব্রাজিলে চিকুনগুনিয়ার উৎস শনাক্ত করা হয়েছিল।

গবেষকরা জানান, আক্রান্ত পাঁচজনই গুরুতর অসুস্থতায় ভুগেছেন। তবে পাশের দেশগুলোতে একই ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর উপসর্গ তুলনামূলক মৃদু ছিল। এতে দেশে কম তীব্রতার সংক্রমণ শনাক্তের বাইরে থেকে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

আইইডিসিআরের পরিচালক ড. তাহমিনা শিরীন বলেন, নিপাহ ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে আসা প্রায় ১৩০ রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে পাঁচজনের শরীরে রিওভাইরাস পাওয়া যায়। নমুনা পরীক্ষায় সবারই নিপাহ ভাইরাস নেগেটিভ ছিল। নতুন রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু শনাক্তের নিয়মিত গবেষণার অংশ হিসেবেই এই পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণায় অংশ নেওয়া বাদুড়বাহিত রোগ বিশেষজ্ঞ আরিফুল ইসলাম বলেন, এই গবেষণা বাদুড় থেকে মানুষের মধ্যে ভাইরাস সংক্রমণের সরাসরি বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দেয়। এখন বাদুড় থেকে মানুষ ও গৃহপালিত প্রাণীতে সংক্রমণ ছড়ানোর প্রক্রিয়া এবং পদ্মা অববাহিকায় ভাইরাসের পরিবেশগত বিস্তার নিয়ে কাজ চলছে।

আইইডিসিআরের সহযোগী অধ্যাপক ড. শারমিন সুলতানা বলেন, বাদুড় মানুষের খাবারের সংস্পর্শে আসছে। তাই আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে। আংশিক খাওয়া বা পোকায় কাটা ফল খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। যে কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত কাছের হাসপাতালে যেতে হবে। 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, রিওভাইরাস সংক্রমণের চিকিৎসায় নিপাহ ভাইরাসের মতো নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। তাই রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসাই একমাত্র ভরসা। তিনি জানান, সাধারণভাবে যেসব রিওভাইরাস মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনকেফালাইটিস) ঘটায়, সেগুলোর উপসর্গ নিপাহ ভাইরাসের সঙ্গে অনেকটাই মিল রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, মুখ দিয়ে লালা ঝরা, তীব্র মাথাব্যথা, প্রচণ্ড জ্বর, আবোলতাবোল কথা বলা এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলা।

তিনি আরও বলেন, শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ হলে হাঁচি-কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। আবার পরিপাকতন্ত্র আক্রান্ত হলে বমি ও ডায়রিয়া হতে পারে। রিওভাইরাসের সংক্রমণ যদি গুরুতর হয়, বিশেষ করে মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনকেফালাইটিস হলে তখন রোগীর অবস্থার ওপর ভিত্তি করে উন্নত চিকিৎসা দিতে হয়।

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News