নড়াইলের রানীর ভলিবল জয়ের গল্প

Date: 2026-01-13
news-banner

নড়াইলের এক পড়ন্ত বিকেল। গাছের পাতা গলিয়ে আসা রোদ চিকচিক করছে খেলার মাঠে। নেটের একপাশ থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ১৫ বছরের কিশোরী রানী বিশ্বাস। সজোরে হাত ঘুরিয়ে ভলিবলটি সার্ভ করে পাঠিয়ে দিল প্রতিপক্ষের কোর্টে। নিমেষেই সতীর্থদের হাততালি আর উল্লাসে মেতে উঠল পুরো মাঠ।
মাত্র দুই বছর আগেও এই দৃশ্য ছিল কল্পনাতীত। জার্সি গায়ে, হাজারো দর্শকের সামনে উপজেলা পর্যায়ে খেলবে–এমন স্বপ্ন দেখার সাহসও ছিল না রানীর। বাবা চলে যাওয়ার পর মা সুচিত্রাই ছিলেন তার সব। অভাবের সংসারে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করে মেয়েকে স্কুলে পাঠাতেন মা। স্বভাবগতভাবেই রানী ছিল খুবই লাজুক ও অন্তর্মুখী। সেই রানীই নড়াইল সদরে ইউনিসেফের ‘স্পোর্টস ফর ডেভেলপমেন্ট’ কর্মসূচির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। রানীর জীবনের মোড় ঘুরে যায় এক দুপুরে। দরজায় কড়া নাড়েন সমাজকর্মী শিউলি মোর্শেদা। তিনি এসেছিলেন পাড়ার মেয়েদের খেলাধুলায় আমন্ত্রণ জানাতে। ফুটবল, কাবাডি, ভলিবল, ক্রিকেট কিংবা কারাতে–এই পাঁচটির মধ্যে রানী বেছে নেয় ভলিবলকে।

সুচিত্রা (৫০) চেয়েছিলেন মেয়ে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসুক। মায়ের সেই উৎসাহই রানীর মনে সাহস জোগায়। রানীর পরিবর্তন সম্পর্কে শিউলি মোর্শেদা বলেন, ‘সে ছিল এক শান্ত ও অন্তর্মুখী মেয়ে। আজ সে এক আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী ভলিবল খেলোয়াড়; যে জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন দেখে।’ রানী জানায়, ‘প্রথমে খুব লজ্জা লাগত; কিন্তু শিউলি আপু মাকে বোঝালেন যে খেলাধুলা কেবল শরীরচর্চা নয়, এটি মেয়েদের আত্মবিশ্বাস, দলগত কাজ এবং শৃঙ্খলা শেখায়। এখন তো স্টেডিয়ামটাই আমার দ্বিতীয় ঘর মনে হয়।’ কেবল খেলাই নয়, ইউনিসেফের এ কর্মসূচির মাধ্যমে রানী ও তার সতীর্থরা বাল্যবিয়ে, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা এবং ‘গুড টাচ ও ব্যাড টাচ’-এর মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো সম্পর্কে জেনেছে। রানীর কণ্ঠে এখন দৃঢ়তা, ‘আগে আমি চুপ থাকতাম। এখন রাস্তায় কাউকে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করতে দেখলে আমি প্রতিবাদ করি।’ উপজেলা পর্যায়ে খেলার সুযোগ পাওয়া রানীর জন্য সহজ ছিল না। কোচের সমর্থন আর স্কুলের উৎসাহে সে এগিয়ে গেছে। রানীর অনুপ্রেরণা বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের ঋতুপর্ণা চাকমা এবং বিশ্বসেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি। রানী বলে, ‘আমি প্রমাণ করতে চাই, মেয়েরাও অনেক বড় কিছু অর্জন করতে পারে।’

রানীর এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় শক্তি তার মা সুচিত্রা। তিনি বলেন, ‘শুরুতে ভয় ছিল সমাজ কী বলবে। কিন্তু আমি জানি, আমার মেয়ের জন্য এটাই সঠিক পথ। আমার খুব কম বয়সে বিয়ে হয়েছিল; তাই স্কুলে যেতে পারিনি। আমি চাইনি রানীর জীবনটাও এমন হোক।’ মা হিসেবে সুচিত্রার গর্বের শেষ নেই। তিনি বলেন, ‘‘ও যখন হাসিমুখে বাড়ি ফিরে বলে–‘মা, আজ খুব ভালো খেলেছি’, তখন আমার বুকটা ভরে যায়। ও নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায় আর আমি আজীবন ওর পাশে থাকব।’’ এই পরিবর্তনের নেপথ্যে সমাজকর্মী শিউলি মোর্শেদার ভূমিকা অপরিসীম। তার কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ‘অনেক পরিবার মনে করে খেলাধুলা কেবল ছেলেদের জন্য। আমি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মা-বাবাকে বোঝাই, এই কর্মসূচি তাদের সন্তানদের আত্মনির্ভরশীল ও মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তুলবে।’
অনেক সময় মায়েরা গোপনে মেয়েদের খেলতে পাঠাতেন, কিন্তু বাবারা জানলে বাধা দিতেন। শিউলি তখন বাবাদের নিয়ে সেশন করতেন, তাদের বোঝাতেন। তিনি বলেন, ‘যখন অভিভাবকরা দেখেন তাদের মেয়েরা ভালো খেলছে এবং শিক্ষার পাশাপাশি সার্টিফিকেটও পাচ্ছে, তখন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়।’
ইউনিসেফ এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে ২০২২ সালে শুরু হওয়া ‘স্পোর্টস ফর ডেভেলপমেন্ট’ কর্মসূচিটি ধীরে ধীরে বাংলাদেশে একটি সামাজিক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। সৌদি আরবের ‘কিং সালমান হিউম্যানিটেরিয়ান এইড অ্যান্ড রিলিফ সেন্টার’-এর উদার সহযোগিতায় পরিচালিত এই প্রকল্প ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের ৩৮টি স্পটে (২৬টি জেলা ও ১২টি সিটি করপোরেশন) ফুটবল, ভলিবল, ক্রিকেট, সাঁতার, স্কেটবোর্ডিং এমনকি সার্ফিংয়ের মতো ইভেন্টে অংশ নিচ্ছে হাজারো শিশু-কিশোর। তাদের এই অদম্য স্পৃহাই বলে দেয়–আগামীর বাংলাদেশ হবে আরও আত্মবিশ্বাসী, আরও শক্তিশালী।

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News