রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কারণেই ত্বকীসহ অনেক হত্যার বিচার হচ্ছে না

Date: 2026-01-11
news-banner

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আশা ছিল ত্বকীসহ যেসব হত্যার বিচর হয়নি, সেই মামলাগুলো শেষ হবে। কারণ শেখ হাসিনার আমলে আমরা জেনেছি, তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকার কারণে বিচার আটকে আছে। তাঁর আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় বেছে বেছে কিছু হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা চলে যাওয়ার পর এই ১৫ মাসে মামলাগুলোর কোনো অগ্রগতি হয়নি। বাধাটা কোথায়, সেটাও জানি না। গত সরকারের সময় দেখেছি, সরকার যা চায়, আদালত ঠিক সেটাই করেন। এই সরকারের আমলেও এর কোনো ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে না। মূলত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কারণে ত্বকী হত্যার বিচার হচ্ছে না। 
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের বেগম সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে  আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অতিথিরা এসব কথা বলেন। নারায়ণগঞ্জে খুন হওয়া মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর ৩০তম জন্মবর্ষ উপলক্ষে একাদশ জাতীয় ত্বকী চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতার পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ। 

রাষ্ট্রের একটা চরিত্র উন্মোচিত হয়েছে 
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ত্বকী হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল ১০০ বার পেছানো হয়েছে। সাগর-রুনি হত্যার প্রতিবেদন দাখিল পেছানো হয়েছে ১২৩ বার। অথচ পুলিশ কি পারে না তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে? তারা তো পারে। কিন্তু তারা করছে না। কারণ, তাদের করতে দেওয়া হচ্ছে না। এখানেই রাষ্ট্রের একটা চরিত্র উন্মোচিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কারণে ত্বকী হত্যার বিচার হচ্ছে না। ত্বকী হত্যা কেবল একটা ঘটনা নয়, এটি এমন অসংখ্য ঘটনার প্রতীক। 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, রাষ্ট্রের উন্নতি হচ্ছে। তবে যত উন্নতি হচ্ছে, তত বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে, মানুষের অভাব বাড়ছে, বৈষম্য বাড়ছে এবং প্রকৃতি বিপন্ন হচ্ছে। আমাদের সমাজে বিচার নেই, নিরাপত্তা নেই। নারী ও কিশোর বটেই, কোনো মানুষেরই নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি নেই। ত্বকী হত্যার বিচার পেলেই এই ব্যবস্থার প্রতিকার হবে– বিষয়টা এমন না। এই উন্নয়নের ধারাকে বদলাতে হবে, ব্যবস্থাকে বদল করতে হবে। এটা সহজ কাজ নয়। এর জন্য ব্যক্তি মালিকানাকে বিদায় করে সামাজিক মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। 

শেখ হাসিনা যা যা করতে চেয়েছিলেন, সবই এই সরকার করতে চায়: আনু মুহাম্মদ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর এই আশা করাটা খুব বেশি ছিল না যে, ত্বকী হত্যার বিচার হবে। কারণ শেখ হাসিনার আমলে আমরা জেনেছি, তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকার কারণে বিচার আটকে আছে। শেখ হাসিনা চলে যাওয়ার পর যুক্তিসংগতভাবেই প্রত্যাশা ছিল, এখন তো বিচার হতে বাধা নেই। কিন্তু এই ১৫ মাসে সেই বিচার হয়নি। সেই বাধাটা কোথায়, সেটাও আমরা জানি না। তাহলে এই সরকার কি শেখ হাসিনার সম্প্রসারণ হিসেবে কাজ করছে– এই প্রশ্নটা কেবল ত্বকীর ক্ষেত্রেই নয়, বরং আরও অনেক ক্ষেত্রেই রয়েছে। শেখ হাসিনার উন্নয়ন প্রকল্প, কর্মসূচি ও চুক্তি সবই অব্যাহত রয়েছে। তাহলে এই সরকারকে শেখ হাসিনার সম্প্রসারিত সরকার বললে খুব একটা ভুল হবে না। শেখ হাসিনা যা যা করতে চেয়েছিলেন, সবই এই সরকার করতে চায়। 
তিনি বলেন, যারা ত্বকী হত্যার সঙ্গে অভিযুক্ত, তারা জামিন পেয়ে গেছে। অথচ সেলিনা হায়াৎ আইভীর মতো যারা হত্যার প্রতিবাদ করেছেন, তারা জামিন পাচ্ছেন না। তনু, সাগর-রুনি কিংবা জিনিয়া হত্যাকাণ্ডের বিচার এই সরকারের আমলে দ্রুত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই সরকার বিচার না করে পাইকারিভাবে মামলা দিয়ে বিগত সরকারের মতো বিচারব্যবস্থাকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করার সংস্কৃতি বজায় রেখেছে। গত সরকারের সময় দেখেছি, সরকার যা চায়, আদালত ঠিক সেটাই করেন। এই সরকারের আমলেও এর কোনো ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে না। 

রাষ্ট্র অগ্রাধিকার দিলে এসব হত্যার বিচার হওয়া সম্ভব: সারা হোসেন 
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ত্বকী হত্যাসহ জুলাইয়ে হত্যাকাণ্ড চালানো শামীম ওসমানরা দেশের বাইরে বহাল তবিয়তে আছে। ত্বকী হত্যার বিচারকে অন্তর্বর্তী সরকার কেন গুরুত্ব দিতে পারছে না? জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়া হচ্ছে, ত্বকীও কি তাদের চেয়ে কম? সে বেঁচে থাকলে আন্দোলনে থাকত। রাষ্ট্র যদি এই বিচারের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে বিচার হওয়া সম্ভব। 

আশা করি, নতুন সরকার আসার পর ত্বকী, সাগর-রুনি, তনুসহ সবার হত্যার বিচার হবে: জ্যোতির্ময় বড়ুয়া 
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ত্বকী হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী যখন সংসদে হত্যাকারীদের পক্ষে থাকার কথা বলেন, তখন কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে প্রকৃত চার্জশিট দেওয়া সম্ভব না। তাহলে চব্বিশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও কেন এই হত্যার বিচার হচ্ছে না। আমরা আশা করতে চাই, আগামী ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার আসার পর এই হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হবে। পাশাপাশি সাগর-রুনি, তনুসহ যারা বিচারের অপেক্ষায় আছেন, তারা যেন বিচার পান। 
ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক ও ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ত্বকী মঞ্চের সদস্য সচিব কবি ও সাংবাদিক হালিম আজাদ প্রমুখ। আলোচনা শেষে অতিথিরা চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন।

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News