টেকসই গণতান্ত্রিক বন্দোবস্তের দিকে এগিয়ে যেতে হবে

Date: 2026-01-11
news-banner

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশবাসী দীর্ঘদিন পর ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ছোট-বড় অনেক দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে প্রতিটি দল তার নিজস্ব নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে জনগণের কাছে ভোট প্রার্থনা করবে। সেই ইশতেহার বিবেচনায় নিয়ে জনগণ আগামী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত দেবে।

আমরা আশা করি, এই নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র, সুশাসন আর জবাবদিহিতামূলক সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমনপীড়ন ও প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান ঘটবে। লাগামহীন সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়া ছাত্রলীগের নেতাকর্মীর মতো আর কোনো ছাত্র সংগঠন বেড়ে উঠবে না। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মতো একটা মডারেট ইসলামী দেশকে জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার যে অপপ্রয়াস আমরা দেখেছি, এ থেকে পরিত্রাণের পথ খোঁজা হবে।

রাষ্ট্র শাসনে আওয়ামী লীগ প্রতিটি ঘটনায় যে চরম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে, তা মানুষের হৃদয় থেকে মুছে যায়নি এবং যাবে না। আওয়ামী লীগ আমলে নিজ দলের বা সরকারের অপকর্ম ও দুর্বলতাকে আড়াল করার যে হীন প্রয়াস আমরা দেখেছি। ক্ষমতার মোহ মানুষকে কতখানি অন্ধ করতে পারে, তা আমরা সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রীর আচরণে দেখেছি। কোনো কিছুকে তোয়াক্কা না করে শেখ হাসিনা তাঁর দেড় যুগের শাসনামলে নিজেকেই রাষ্ট্র মনে করতেন। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভয়াল আতঙ্ক, গুম-খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, জঙ্গি দমনের নামে মানুষ হত্যা, দুর্নীতি, লুটপাট, গায়েবি মামলা, মানবাধিকার হরণ, বিনা কারণে চাকরিচ্যুত, বিরোধী আদর্শের রাজনীতি নির্মূল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। সিভিল প্রশাসন, নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত করে একদলীয়, কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। প্রশাসনিক নিয়মকানুন, রীতিনীতি ভঙ্গ করে আজ্ঞাবহ, দলদাস ও মুজিব পরিবারের সদস্যদের দিয়ে দেশ পরিচালনা করেছে।

তবে এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘ ১৭ বছর পর তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। গত ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে সমগ্র মানুষ তাঁকে যেভাবে অভিবাদন জানিয়েছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। লন্ডনে বসবাস করলেও বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনা, প্রেক্ষাপট ও আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তাঁর দল ভোটে জয়ী হলে তিনি সরকার পরিচালনায় নেতৃত্ব দেবেন বলে আমরা আশা করি। 

শহীদ জিয়া যেভাবে গ্রামগঞ্জে খাল কেটে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে, রাস্তা বানিয়ে, রাস্তার দুপাশে গাছ রোপণ করে, তিন ফসলি বা চার ফসলি আবাদ ভূমি তৈরি করে কৃষিবিপ্লব ঘটিয়েছেন, বিদেশে কর্মী প্রেরণ করে ফরেন রেমিট্যান্স আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন, গার্মেন্ট শিল্পের বিকাশ ঘটিয়েছেন, তেমনি তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তারেক রহমান এই ক্ষেত্রগুলোকে আরও প্রসারিত করবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। উপরন্তু, বাংলাদেশের বিদ্যমান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করে সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচনসহ সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন বলে আমরা আশা করতে চাই। বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার হওয়া যেসব কর্মকর্তা ও কর্মচারী ২০২৪-এর আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছেন, তাদের প্রতি সদয় হয়ে তাদের প্রজ্ঞা ও মেধাকে দেশের স্বার্থে কাজে লাগানো প্রয়োজন বলে মনে করি। কারণ, এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী দীর্ঘদিন পদোন্নতি, পদায়নে বঞ্চিত হওয়ায় তাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মর্যাদা ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। 

পরিশেষে বলতে চাই, আগামী ফেব্রুয়ারিতে একটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকৃত অংশীদারিত্বমূলক, সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক ন্যায়বিচার, নারীর অধিকার ও সুযোগের সমতা, আইনের শাসন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। যা হবে আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের রায়। প্রতিহিংসার রাজনীতির বদলে সব মত ও পথের সমন্বয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। যেখানে সম্ভাব্য উচ্চতম প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম একটি দ্রুত বিকাশশীল অর্থনীতির মাধ্যমে দারিদ্র্যের লজ্জা ঘুচিয়ে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করবে। কোনো দুঃশাসন ও দুর্বৃত্তায়নের পুনরাবৃত্তি আর ঘটবে না। একটা স্থায়ী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দিকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে বলে সবার প্রত্যাশা।

মো. শেখাবুর রহমান: সাবেক 
সরকারি কর্মকর্তা

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News