আইনের ক্যানভাসে কৃষক ও বীজ
Date: 2026-01-07
আন্তর্জাতিক ও বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ আইনে বীজের ওপর কৃষকের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হলেও এ এক নির্মম সত্য, পৃথিবীর অন্যতম বীজভাণ্ডার বাংলাদেশের এ-সংক্রান্ত আইন কৃষকবান্ধব নয়। সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশে অঙ্গীকার করা হয়েছিল– কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষকে শোষণ থেকে মুক্তি দেওয়া হবে। তবুও রোদে পোড়া কৃষক কেন পেল না বটবৃক্ষের ছায়া? বাংলার নিরন্ন কৃষককে রক্ষা করার অঙ্গীকারবদ্ধ বাংলাদেশ কেন হাঁটল উল্টো পথে?
বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয় তখন এশিয়ার দেশগুলোতে বইছিল সবুজ বিপ্লবের ঝোড়ো হাওয়া। সবুজ বিপ্লব আনল ‘উন্নত’ জাতের বীজ। গবেষণাগারে কৃষকের বীজের জিনগত সম্পদের সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটল বিজ্ঞানীর মেধা-মননের। তৈরি হলো উন্নত জাতের বীজ। এলো কীটনাশকসহ নানা রাসায়নিক পদার্থ।
শতবছরের পরাধীনতায় নিষ্পেষিত, দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলার মানুষের পৃথিবী তখন ক্ষুধার রাজ্যে গদ্যময়। পরাধীনতা, যুদ্ধ বদলে দিয়েছিল ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ চিরচেনা বাংলার ল্যান্ডস্কেপ। সদ্যোজাত বাংলাদেশ। তাই দ্রুত ক্ষুধামুক্তির আশায় পাশ্চাত্যের রেসিপি গোগ্রাসে গিলল। লুফে নিল কুহকের ডাক– সবুজ বিপ্লব। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৬ বলল– ‘নগর ও গ্রামাঞ্চলের জীবন যাত্রার মানের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করিবার উদ্দেশ্যে কৃষিবিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতীকরণের ব্যবস্থা, কুটিরশিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগ-ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল রূপান্তরসাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’
কৃষিবিপ্লব অন্য অর্থে সবুজ বিপ্লব ঘটা করেই বাংলায় এলো সত্তরের দশকে। পাশ্চাত্যের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা যেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা হয়ে এলো বাংলায়। সেই বাঁশি শুনে আমরা মোহগ্রস্তের মতো হাঁটলাম অজানা পথে। উন্নত জাতের বীজ ও সারের পসরায় সাজল আামাদের কৃষিবাজার। খাদ্য উৎপাদন বাড়ল বটে, তবে মোহভঙ্গ ঘটল। কৃষক হলো হতবিহ্বল। কেন?
গবেষক মিলন দত্ত তাঁর গবেষণায় বলেন, সবুজ বিপ্লবের আগে বাংলায় চার হাজার ৮০০ আদি প্রজাতির ধান চাষ হতো। সবুজ বিপ্লবের প্রলয় তাণ্ডবে বাংলা হারাল নাম না জানা অসংখ্য ধানের বীজ; সেই সঙ্গে জীববৈচিত্র্যের বিপুল সম্ভার।
আইন বিশ্লেষণে আমি পেয়েছি চাঞ্চল্যকর তথ্য। ১৯৭৭-২০১৮ পর্যন্ত বীজ আইন সুকৌশলে কৃষককে পরিণত করেছে উন্নত জাতের বীজ ও সারের গ্রাহকে। ১৯৯৪ সালের বীজনীতি বীজ বোর্ডকে দিল প্রভূত ক্ষমতা। এই বীজনীতির মূল লক্ষ্য ছিল খাদ্য উৎপাদনে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এতে বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলোর ভাগ্যের চাকা ঘুরল।
১৯৯৮ সালের বিধ্বংসী বন্যায় কৃষক হারাল তার প্রাণের ফসল। সে বছরই বন্যার ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে বীজ বোর্ড সরকারকে হাইব্রিড বীজ আমদানির অনুমতি দিল।
ভয়াবহ এ বন্যাকে পুঁজি করে বিদেশি কোম্পানির হাইব্রিডজাত বীজ খানিকটা জোর করেই চাপানো হলো কৃষকের কাঁধে। প্রায় দুই যুগ পর প্রান্তিক কৃষক আমাকে জানিয়েছে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশে তারা কেমন আছে। এ যেন প্রদীপের নিচেই অন্ধকার।
কৃষক জানাল, ‘হাইব্রিড ব্যবহার করি। এটি ব্যবহারে সরকার আমাদের উৎসাহিত করে। কারণ তাতে ফলন বেশি হয়। হাইব্রিড ব্যবহার করলে বীজ কোম্পানিও সহায়তা করে। কিন্তু হাইব্রিডে ফলন বেশি হলেও সারের প্রয়োজন হয় বেশি। হাইব্রিড বীজ ঘরে সংরক্ষণ করা যায় না। প্রতি মৌসুমে কোম্পানির কাছ থেকে সার ও বীজ কিনে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাই। ফলন বেশি হলেও লাভের আশার গুড়ে বালি!’
বিখ্যাত আইন গবেষকরা বলেন, বীজ আইন, বীজ-সংক্রান্ত মেধাস্বত্ব ও চুক্তি আইনগুলো ব্যবহৃত হয় সমাজের অল্পসংখ্যক ধনী মানুষের স্বার্থ রক্ষায়। এরা প্রভাবশালী ও সমাজের নিয়ন্ত্রক। বীজ কোম্পানিগুলো সেই প্রভাবশালী মহলের প্রতিনিধিত্বকারী। আন্তর্জাতিক একটি আইন হলো ট্রেড রিলেটেড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস ১৯৯৪ (ট্রিপস)। এই আইন পাশ্চাত্যের ধনী দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে আসছে। অন্যদিকে কৃষিপ্রধান দরিদ্র দেশগুলোকে কুপোকাত করেছে নানা কঠিন শর্তে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঘটেনি তার ব্যতিক্রম।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য হিসেবে ট্রিপসের শর্ত পূরণে বাংলাদেশ প্রণয়ন করে উদ্ভিদের জাত সংরক্ষণ আইন-২০২১। উন্নত বীজ উদ্ভাবনে জিনবিজ্ঞানীদের মেধাস্বত্বের স্বীকৃতি দেওয়া এ আইনের মূল উদ্দেশ্য। এ আইনের অধীনে জিনবিজ্ঞানীরা তাদের উদ্ভাবিত উন্নত বীজ ব্যবহার, বিপণন নিয়ন্ত্রণ করবেন। এটি নিঃসন্দেহে কৃষকের অবাধ বীজ বিনিময়কে হুমকির মুখে ফেলবে। বীজের আকাশছোঁয়া দামের আশঙ্কাও অমূলক নয়।

সম্ভবত সেই আশঙ্কা বিবেচনায় এ আইন কৃষকের কিছু অধিকার স্বীকার করেছে। আইনে কৃষককে জিনবিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত সংরক্ষিত জাতের বীজ ব্যবহার ও বিনিময়ের অধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, কৃষক বীজ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করবে না। কৃষককে দেওয়া হয়েছে তাদের বীজের কৌলীন সম্পদ ব্যবহারের জন্য জিনবিজ্ঞানীদের কাছ থেকে সুবিধা পাওয়ার অধিকার। কৃষক পেয়েছে তাদের উদ্ভাবিত জাতের বীজ নিবন্ধনের অধিকার। যদিও এসব অধিকারের প্রয়োগ নিয়ে রয়েছে ধূম্রজাল; আইনি ভাষার অস্পষ্টতা। আমার গবেষণায় পেয়েছি বিস্ময়কর তথ্য– বাংলার প্রান্তিক কৃষকসহ মানবাধিকারকর্মী ও পরিবেশবাদীরা এই আইনের অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ। ভয়াবহ বিষয় হলো, কৃষক যদি অজ্ঞানতাবশত বাণিজ্যিকভাবে সংরক্ষিত জাতের বীজ ব্যবহার করে তাহলে তার নেই কোনো সুরক্ষা; আইনে রয়েছে শাস্তির বিধান।
২০২১ সালের এই আইন জিনবিজ্ঞানী বা প্রজননবিদদের মেধাস্বত্ব রক্ষায় যথেষ্ট সুরক্ষা দিলেও বলতে দ্বিধা নেই, কৃষক পায়নি তার ন্যায্য অধিকার। যদি জিনবিজ্ঞানী বা বীজ কোম্পানির উদ্ভাবিত বীজ ব্যবহার করে কৃষক ও তার ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে এই আইনের অধীনে কৃষকের নেই কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার। কৃষকের আবহমান সৃজনশীল অবদানকেও দেওয়া হয়নি যথাযথ মর্যাদা; সরাসরি কৃষককে বলা হয়নি বীজের প্রজননবিদ। কৃষকের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় এ আইনের সংস্কার প্রয়োজন।
কৃষকের এ দুর্ভোগ আমাদের মানচিত্র ছাপিয়ে কৃষিপ্রধান দেশের মানবতাবাদীদের ভাবাচ্ছে। তাদের সম্মিলিত পদক্ষেপে সাড়া দিয়ে ২০১৮ সালে জাতিসংঘ কৃষকদের অধিকার সংক্রান্ত সনদে বীজের ওপর কৃষকের অধিকারকে মানবাধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। কৃষকদের এ অধিকার সনদ ইউনাইটেড নেশনস ডিক্লারেশন অন দ্য রাইটস অব পেজেন্টস (আনড্রপ) হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশ এ সনদের পক্ষে ভোট দিলেও কৃষকদের অভিজ্ঞতা ও দুর্দশার চিত্র তুলে ধরতে বরাবরই দেখিয়েছে অনীহা। আনড্রপ সনদের অনুচ্ছেদ ১৯ ‘কৃষকের বীজের অধিকার’ দিতে পারে ২০২১ সালের আইনটি সংস্কারের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা। এভাবেই হয়তো সুড়ঙ্গের শেষে আলো দেখব আমরা।
কবি জীবনানন্দ দাশ কার্তিকের নবান্নের দেশে ফিরতে চেয়েছিলেন ভোরের কাক হয়ে, নদী-মাঠ-ক্ষেত ভালোবেসে। এ বাংলার বাতাসে পেয়েছিলেন পাকা ধানের গন্ধ। আবহমান বাংলার কৃষকরা বাংলাকে সাজিয়েছে; উপহার দিয়েছে নবান্ন উৎসব; দিয়েছে ভুবনজয়ী অসংখ্য ধান ও সেই ধানের হৃদয় আকুল করা সৌরভ।
আমরা যেন প্রযুক্তির দাস হয়ে কৃষি থেকে কৃষককে বিদায় না করি। তাই ধান উদ্ভাবক জগদ্বিখ্যাত জিনবিজ্ঞানী আবেদ চৌধুরী প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন কৃষকের কল্যাণে। তিনি বলেন, ‘বীজ কৃষকের হাতছাড়া হলে কৃষক বাঁচবে না। তাই আমার উদ্ভাবিত বীজ আমি কৃষকের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছি। কৃষক তা অবাধে ব্যবহার ও সংরক্ষণ করতে পারবে।’ তিনি নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বাংলার কৃষকের বন্ধু হয়ে। তাদের দিচ্ছেন বটবৃক্ষের ছায়া। এখনও কৃষিপ্রধান দেশের কৃষকরা পৃথিবীর ৭০ শতাংশ খাদ্য উৎপাদন করে। তাই ‘কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ’। বাঁচবে এ বসুন্ধরা।
সুস্মিতা চৌধুরী: পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব নিউক্যাসল অস্ট্রেলিয়া

