গত বছর মাঘের মাঝামাঝি। প্রকৃতিতে জেঁকে বসেছে শীত। গিয়েছিলাম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে তাদের এই বাগান। প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করে সোজা এগিয়ে গিয়ে ডান দিকের পথ দিয়ে একটু এগিয়ে যেতেই বাঁ দিকে চোখ আটকে গেল একটি গুল্মের দিকে। গাছের গা থেকে ঝুলছে সাদা রঙের অসংখ্য ফুল। দেখতে সাদা প্রজাপতির মতো। মনে হয়, যেন সাদা ফুলের ঝর্ণা মাটিতে নেমে এসেছে।
ইংরেজিতে এই উদ্ভিদ চেইন অব গ্লোরি, লাইট বাল্ব ফ্লাওয়ার ইত্যাদি নামে পরিচিত। ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও চীনে এই ফুল পাওয়া যায়। উদ্ভিদে ফুল ফোটে শীতকালে। চেইন অব গ্লোরি যেন শীতের রাতের জ্বলজ্বলে আলো। বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘গৌরব শৃঙ্খল’।
উদ্ভিদটির বৈজ্ঞানিক নাম Clerodendrum schmidtii। এটি Lamiaceae পরিবারের গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। পরিচিত ভাট, সহস্র বেলি এই গোত্রের উদ্ভিদ। চেইন অব গ্লোরির আদি নিবাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া।
শীত এলেই এর ঝুলন্ত ফুলগুলো ছোট ছোট বাল্বের মতো জ্বলে ওঠে। পুরো গাছই যেন এক আলোর মালা। এ জন্য ইংরেজিতে এর আরেক নাম লাইট বাল্ব ফ্লাওয়ার।
চেইন অব গ্লোরি গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। এটি অনেক কাণ্ডবিশিষ্ট। কাণ্ড থেকে শাখাগুলো ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে। শীতকালে এই গুল্মে লম্বা, ঝুলন্ত, দেড় ফুট লম্বা পুষ্পমঞ্জরি তৈরি হয়। সাদা সুগন্ধি ফুলগুলো ঝুলন্ত এই মঞ্জরিতে গুচ্ছাকারে উৎপন্ন হয়। দেখে মনে হয়, লম্বা গাঢ় লাল ডাঁটার ওপর সাদা ফুলগুলো গাঢ় সবুজ পাতার বিপরীতে নৃত্য করছে। খুব আকর্ষণীয় দৃশ্য। ফুলের কুঁড়ি দেখতে সাদা মুক্তার মতো।
এই উদ্ভিদে ফুল ফোটে বড়দিনের সময়। ফুলসহ চেইন অব গ্লোরিকে দেখলে মনে হয়, তুষারপাতের পর উদ্ভিদে বরফ জমে আছে। রাতের আলোয় এর সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়।
এই উদ্ভিদে শীতকালে দুবারও ফুল ফুটতে পারে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনের বাইরে উদ্ভিদটিকে আর কোথাও দেখিনি আমি। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই গাছের জন্য বেশি যত্নের দরকার হয় না। একটা ছোট টবেই বছরখানেক ধরে টিকে থাকলেই সাদা ফুলের ঝর্ণার সৌন্দর্যে চারপাশ ভরিয়ে দেয়।
Bridal veil নামে পরিচিত Clerodendrum wallichii-এর সঙ্গে চেইন অব গ্লোরি ফুলের আকৃতিতে মিল থাকলেও অন্য অনেক বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য রয়েছে। অনেকে ব্রাইডাল ভেইল উদ্ভিদকে চেইন অব গ্লোরি ভেবে ভুল করতে পারেন। ব্রাইডাল ভেইল উদ্ভিদ বাংলায় তারাভাট নামে পরিচিত। চেইন অব গ্লোরির গাঢ় লাল ডাঁটা রয়েছে এবং সেগুলো অনেক লম্বা। অন্যদিকে, ব্রাইডাল ভেইলের ডাঁটা ছোট এবং সম্পূর্ণ সবুজ। চেইন অব গ্লোরির সামগ্রিক চেহারা আরও ভঙ্গুর এবং লেইসের মতো। ব্রাইডাল ভেইলের পাতাগুলো চেইন অব গ্লোরির চেয়ে বেশি সরু। ফুলের আকৃতির দিক থেকে দেখতে অনেকটা একই রকম, তবে চেইন অব গ্লোরিতে কম পুংকেশর থাকে। ব্রাইডাল ভেইল ফিল্টার করা আলোতে সবুজ এবং স্বাস্থ্যকর দেখায়, আর চেইন অব গ্লোরি পূর্ণ রোদে সবচেয়ে ভালো দেখায়।
লেখক : উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক।