হাওরে বালাইনাশক বিক্রি ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হবে
Date: 2026-01-05
আসন্ন বোরো মৌসুমে হাওর অধ্যুষিত সাতটি জেলায় কৃষি খাতে বালাইনাশকের বিক্রি ও ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে বালাইনাশক ব্যবহারের ওপর নজরদারি জোরদার করা হবে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাড়ানো হবে।
হাওরাঞ্চলে কৃষিতে বালাইনাশক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও সীমিতকরণে করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় কমিটির দ্বিতীয় সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গতকাল রোববার সকালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে এ সভা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, বর্ষা শেষে হাওরের পানি নেমে গেলে রবিশস্য বিশেষ করে বোরো ধান চাষ শুরু হয়। সর্বোচ্চ ফলনের আশায় অনেক কৃষক অনিয়ন্ত্রিতভাবে বালাইনাশক ব্যবহার করেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মাছ, গবাদি পশু ও হাওরের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর। এই পরিস্থিতিতে বালাইনাশক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ বা সীমিত করা এখন জরুরি।
ফরিদা আখতার আরও বলেন, হাওরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সমন্বিত প্রচেষ্টা দরকার।
সভায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোকাব্বির হোসেন বলেন, কার্বোফুরানসহ কয়েকটি ক্ষতিকর বালাইনাশক ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এসব বালাইনাশকের বাজারজাতকরণ কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। তিনি রাসায়নিক বালাইনাশকের পরিবর্তে জৈব ও বিকল্প বালাইনাশক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, বালাইনাশক ব্যবহার-সংক্রান্ত বিধিমালা চূড়ান্ত হলে মাঠ পর্যায়ে এর ব্যবহার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। তিনি জানান, বর্তমানে দেশে ৩৩৫টি জেনেরিক নামের প্রায় আট হাজার ১০০টি বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডের বালাইনাশক বাজারে রয়েছে, যা পুরোপুরি আমদানিনির্ভর।
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান বলেন, সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা না থাকায় অনেক কৃষক প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বালাইনাশক ব্যবহার করেন। এ সমস্যা কমাতে বালাইনাশক বিক্রির ক্ষেত্রে প্রেসক্রিপশন পদ্ধতি চালুর সম্ভাবনা যাচাইয়ের প্রস্তাব দেন তিনি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের বলেন, বালাইনাশকের বিষাক্ততার মাত্রা পরীক্ষা নিশ্চিত করতে এনআইবি, বিসিএসআইআর ও বারির ল্যাবরেটরি ব্যবহারে সবাই একমত হয়েছে। তবে এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান ও সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে–বালাইনাশকের বোতল ও প্যাকেটে সহজ ও স্পষ্ট বাংলায় ব্যবহার নির্দেশিকা সংযুক্ত করে বাজারজাত করা, হাওর অধ্যুষিত জেলাগুলোতে কৃষকদের জন্য নিরাপদ ও সঠিক বালাইনাশক ব্যবহার বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম জোরদার করা এবং খাদ্য ও পশুখাদ্যে বালাইনাশকের টক্সিসিটি পরীক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া। এ ছাড়া ক্ষতিকর রাসায়নিক বালাইনাশকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে জৈব বালাইনাশক, আইপিএম (ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট) ও জিএপি (গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস) কার্যক্রম জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। হাওর অঞ্চলে বালাইনাশক নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সভায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।

