ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের গ্যাংস্টার হামলা

Date: 2026-01-05
news-banner

দীর্ঘদিন ধরেই কিছু মার্কিন রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ– টেলিভিশন, পশ্চিমা সিনেমা এবং বাচাল কাউবয়ের বীরোচিত বিজয়গাথার অতিরিক্ত প্রভাবে তাদের মস্তিষ্কের টিস্যু ঢিলা হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও এই ঐতিহ্য ভাঙার কোনো সম্ভাবনা ছিল না, যদিও তিনি কিছুটা সংযত– দাবি করা হচ্ছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর সেই সংযম পুরোপুরি নাই হয়ে গেছে। ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনা মোতায়েন হলো; ভিত্তিহীন অজুহাতে ক্যারিবীয় সাগরে তথাকথিত মাদকবাহী জাহাজে বোমা হামলা হলো; অন্যদিকে প্রতিবাদকারীদের গুলি করা হয়েছে বলে ভোররাতে ইরানে হামলার বিভ্রম তৈরি করা হলো।

২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রকাশের পরই স্পষ্ট হয়ে যায়, ট্রাম্পের নেতৃত্বে এই মার্কিন প্রশাসন আন্তর্জাতিক আইনের বাধা ছুড়ে ফেলে দিয়ে গ্যাংস্টারসুলভ আচরণের মুক্ত পোশাক পরতে যাচ্ছে। পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার শক্তি প্রদর্শন করবে এবং আগের মতোই লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর ওপর শর্ত চাপিয়ে দেবে। ওয়াশিংটন এমন এক গোলার্ধ চায়, ‘যেখানে সরকারগুলো মাদক-সন্ত্রাসী ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অপরাধী সংগঠনের বিরুদ্ধে আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করবে’, যা ‘শত্রুভাবাপন্ন বিদেশি অনুপ্রবেশ বা গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের মালিকানা থেকে মুক্ত থাকবে’ এবং ‘গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খল ও কৌশলগত স্থানে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে।’ অন্য কথায়, মনরো নীতির ভিত্তিতে ট্রাম্পের অনুসিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হবে।

এর প্রথম লক্ষ্য হয়েছে ভেনেজুয়েলা। ৩ জানুয়ারি স্থানীয় সময় রাত ২টার কিছু পর ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অপারেশন ‘অ্যাবসলিউট রিজলভ’ নামে মার্কিন বাহিনী হামলা চালায়। ভোর ৪টা ২১ মিনিটে ট্রাম্প ঘোষণা দেন– ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করা হয়েছে। এটি ছিল ‘দুই শতাব্দীরও বেশি পুরোনো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতির গুরুতর লঙ্ঘন।’ মনরো নীতি ছিল বড় বিষয়, ‘কিন্তু আমরা সেটিকে  ছাড়িয়ে অনেক দূর গেছি। এখন একে ডনরো নীতি বলা হয়।’

মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডি দ্রুত ঘোষণা দেন– নিউইয়র্কের সাদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাস ষড়যন্ত্র, কোকেন আমদানি ষড়যন্ত্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভারী অস্ত্র রাখার মতো অবিশ্বাস্য অভিযোগ আনা হয়েছে। আগের মতোই আইনের নমনীয় ও কল্পিত শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করে একটি ভুয়া বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। মাদক সন্ত্রাসের এই উদ্ভাবিত ধারণা ট্রাম্প প্রশাসনের আইনি অজ্ঞতাই প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগ যুদ্ধ ও অপহরণের ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নিয়েছে কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে। এই নাটকের মহড়া শুরু হয় গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর, যখন ট্রাম্প কংগ্রেসে ওয়ার পাওয়ারস নোটিশে জানান– ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরে তথাকথিত মাদকবাহী জাহাজে হামলা ছিল ‘আত্মরক্ষা’। অক্টোবরে নিহতদের ‘অবৈধ যোদ্ধা’ ঘোষণা করা হয়। 

মাদুরোকে মাদক সম্রাট বানানোর কল্পনা মূলত অসার। বাস্তবে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন প্রবাহের তেমন সম্পর্ক নেই। কিন্তু এখানে আছে তেল, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য তা দখল ও নিয়ন্ত্রণ করা, একই সঙ্গে ‘ডনরো ডকট্রিন’ মেনে চলা। এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় তথাকথিত ‘নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’ রক্ষাকারী দেশগুলো দ্বিধায় পড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মাদুরোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের নিন্দা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্রিটেনে নাইজেল ফারাজে একে আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী হলেও চীন ও রাশিয়াকে ভয় দেখাতে পারলে ভালো বলেই মন্তব্য করেন। জার্মান এমপি রডেরিখ কিজেভেটার বলেন, এটি ১৯৪০ সালের আগের মার্কিন প্রভাববলয়ের মানসিকতায় প্রত্যাবর্তন। কিউবা একে সাম্রাজ্যবাদী ও ফ্যাসিস্ট আগ্রাসন বলে আখ্যা দেয়।

১৯৪৫-পরবর্তী বিশ্বে শক্তিধর রাষ্ট্র দ্বারা নেতা অপহরণ নতুন নয়। হাঙ্গেরির ইমরে নাগিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন আটক করে, যিনি ১৯৫৬ সালের হাঙ্গেরিয়ান বিদ্রোহের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। সোভিয়েত ইউনিয়ন শেষ পর্যন্ত বিচার করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। ১৯৬৮ সালের প্রাগ বসন্ত আন্দোলনের নেতা চেকোস্লোভাকিয়ার আলেকজান্ডার ডুবচেক মৃত্যুদণ্ড এড়ালেও সংস্কার চালুর দায়ে সোভিয়েত নেতৃত্বের কাছ থেকে একই ধরনের আদর্শগত শাস্তির সম্মুখীন হন। তাদের প্রভাববলয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন চেয়েছিল যেন কোনো বেপরোয়া নেতাকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া– যে কেউ যে কোনো সময় অপহরণ, হত্যা বা আদর্শগতভাবে ‘পুনঃপ্রশিক্ষিত’ হতে পারে। ট্রাম্প হয়তো না জেনেই এক অত্যন্ত বিতর্কিত ক্লাবের সদস্য হয়ে গেছেন।

বিনয় কাম্পমার্ক: সেলউইন কলেজে কেমব্রিজের সাবেক কমনওয়েলথ স্কলার; মেলবোর্নের আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক; কাউন্টার পাঞ্চ থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News