হাসপাতাল আর বোরো ফসলের মাঠে উৎকণ্ঠা বাড়ছে
Date: 2026-01-05
তীব্র শৈত্যপ্রবাহে নাকাল দেশের প্রায় সব অঞ্চল। দুর্ভোগ আর উৎকণ্ঠা বেড়েছে হবিগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলাতেও। গতকাল রোববার দৈনিক সমকালের নবীগঞ্জ ও মাধবপুর উপজেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে উঠে এসেছে সেই চিত্র।
তীব্র শৈত্যপ্রবাহের কারণে গত ২৪ ঘণ্টায় নবীগঞ্জ উপজেলায় তাপমাত্রা নেমে গেছে হুট করে। শীতের মাত্রা বেশি থাকায় রোগব্যাধির বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে। ঠান্ডাজনিত শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের প্রদাহসহ নানান রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও স্থানীয় ক্লিনিকগুলোতে। বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ঘুরে এমন দৃশ্যই নজরে এসেছে সমকালের।
অপরদিকে, রোগশোকের দুর্ভোগের পাশাপাশি মাধবপুর উপজেলার কৃষকদের মাঝে দেখা গেছে ফসলহানির উদ্বেগ। প্রান্তিক এলাকার ফসলের মাঠে ঘুরে চোখে পড়েছে উৎকণ্ঠিত চাষিদের উপস্থিস্থিতি। স্থানীয় চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বোরো ধানের আবাদে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন ইউনিয়নে বোরো ধানের বীজতলা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে চারা রোপণ নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন কৃষক।
নবীগঞ্জে শীতের তীব্রতায় কাবু হয়ে পড়েছে মানুষ। কনকনে ঠান্ডা বাতাস, ঘন কুয়াশা ও দিনে সূর্যের অনুপস্থিতি জনজীবনে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও নিম্নআয়ের মানুষরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন।
শীতজনিত নানা রোগে আক্রান্ত রোগীর চাপে নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দম ফেলার সুযোগ মিলছে না চিকিৎসক ও নার্সদের। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘড়ি ধরে কাজের সময় নেই তাদের। এমনটাই জানান সেখানে কর্মব্যস্ত এক চিকিৎসক।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য বলছে, নবীগঞ্জের সরকারি ও বেসরকারি ১০টি চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে। রোববার পর্যন্ত নবীগঞ্জ হাসপাতালে ঠান্ডাজনিত রোগে শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এখনও ভর্তি শতাধিক রোগী। অধিকাংশই শিশু ও বৃদ্ধ। শয্যা সংকটে অনেকেই মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এ ছাড়া শীতের কারণে সাধারণ মানুষ পড়েছেন বিপাকে। অনেকেই পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের ব্যবস্থা করতে পারেননি। বিশেষ করে গ্রাম ও হাওর এলাকার মানুষ, দিনমজুর, রিকশাচালক, পথশিশু ও খেটে খাওয়া মানুষদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
শীত বাড়ার সঙ্গে প্রান্তিক এই জনপদে বেড়েছে সর্দি, কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ডায়রিয়া ও ঠান্ডাজনিত নানা রোগ। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতেও রোগীর সংখ্যা বেড়েছে।
নবীগঞ্জ হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি রোগী আসছে। শীতজনিত নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টের রোগী বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে।
নবীগঞ্জ ইউনাইডেট হসপিটালের পরিচালক মাহবুবুল আলম সুমন বলেন, হাসপাতালে আসা অধিকাংশ শিশু ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত। এখন পর্যন্ত ৫০ জন রোগী আমার হাসপাতালে ঠান্ডাজনিত রোগে ভর্তি হয়েছেন।
নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টিএইচও আব্দুস সামাদ বলেন, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টের রোগী বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। হাসপাতালের শয্যা কুলাতে পারছে না। এখন পর্যন্ত শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।
এদিকে মাধবপুর উপজেলার বুল্লা, ছাতিয়াইন, নোয়াপাড়া ও শাহজাহানপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার বোরোর বীজতলায় চারাগাছ হলদে হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও চারা পচে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে হবে।
বুল্লা ইউনিয়নের কৃষক রফিক মিয়া বলেন, দুই সপ্তাহ আগে বীজতলা দিয়েছিলেন। কয়েকদিন ধরে এত ঠান্ডা পড়ছে যে চারাগাছ ঠিকমতো বেড়ে উঠতে পারছে না। অনেক জায়গায় পাতা হলদে হয়ে গেছে, কিছু জায়গায় একেবারেই পচে যাচ্ছে।
ছাতিয়াইন ইউনিয়নের কৃষক মোস্তাক আহমদ বলেন, বোরো ধান সময়মতো রোপণ না করতে পারলে ফলন কমে যায়। এই ঠান্ডায় চারা তোলার মতো অবস্থা নেই। রোদ না উঠলে বীজতলা বাঁচানো যাবে না। সার, বীজ আর শ্রমিকের দাম এমনিতেই বেশি। এবার তাদের বাঁচার উপায় নেই।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সজীব সরকার জানান, তীব্র শৈত্যপ্রবাহের কারণে ধানের বীজতলায় সমস্যা হচ্ছে। কৃষকদের বীজতলা খড় বা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা, সকালে কুয়াশা কেটে গেলে জমির অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ছত্রাকনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রকৃতি সহায় না হলে ফসল উৎপাদন কঠিন। কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে সর্বোচ্চ শ্রম দিচ্ছেন।

