ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার মধ্যাঞ্চলে জাতিসংঘ পরিচালিত একটি স্কুলে এক ছোট্ট তাঁবুতে স্ত্রী, পাঁচ সন্তান ও মা-বাবা আর বোনকে নিয়ে গাদাগাদি করে থাকছেন আলা আলজানিন। বর্তমানে বৃষ্টি-শীতের সঙ্গে যুদ্ধ করেই এই তাঁবুতে থাকতে হচ্ছে বাস্তুচ্যুত পরিবারটিকে। পেশায় দিনমজুর ৪১ বছর বয়সী আলজানিন জানান, যুদ্ধের আগে তাদের বাড়ি ছিল গাজার বেইত হানুন এলাকায়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত আটবার তারা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। গাজার লাখ লাখ মানুষের মতো তিনিও এখন কর্মহীন। ফলে পরিবারের চাহিদা মেটাতে পারছেন না।
আলজানিনের মতোই বেকার অবস্থায় দিন পার করা আরেক ব্যক্তি মাজেদ হামুদা। উত্তর গাজার জাবালিয়া থেকে আসা ৫৩ বছর বয়সী এই ব্যক্তি নিজে পোলিওতে আক্রান্ত এবং তাঁর স্ত্রী থ্যালাসেমিয়ার রোগী। তাঁর পাঁচ সন্তান রয়েছে এবং তারা রিমাল এলাকার একটি স্কুলের ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে হামুদা কাজ করতে না পারায় তিনি সরকারি সমাজসেবা সংস্থা ও সংগঠনের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তাঁর সেই সাহায্য আসা বন্ধ হয়ে গেছে। হামুদা বলেন, ‘আমরা মৃত মানুষের মতো, শুধু কবর দেওয়া বাকি। আমরা শুধু জীবিত মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকি। কুকুরও আমাদের চেয়ে ভালো জীবন কাটায়।’
কাঁদতে কাঁদতে হামুদার এক মেয়ে বলেন, রাস্তার কুকুরকেও কেউ তাড়িয়ে দেয় না, কিন্তু আমাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছি।
দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধের পর ইসরায়েল গাজা উপত্যকাকে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে, যা সেখানে তীব্র ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষ তৈরি করেছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, অবরুদ্ধ এলাকায় যে ত্রাণ প্রবেশ করছে, তা মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। প্রতিদিনের লক্ষ্যমাত্রা দুই হাজার টন হলেও তার চেয়ে অনেক কম সাহায্য প্রবেশ করছে। ফিলিস্তিনি কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো গত অক্টোবরে জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে ফিলিস্তিনে বেকারত্বের হার বেড়ে ৫০ শতাংশ এবং গাজা উপত্যকায় তা ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। পুরো ফিলিস্তিনজুড়ে বর্তমানে সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ বেকার।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের শেষে ফিলিস্তিনের জিডিপি ২০১০ সালের স্তরে ফিরে গেছে। মাথাপিছু জিডিপি নেমেছে ২০০৩ সালের স্তরে। ফলে যুদ্ধে মাত্র দুই বছরে ২২ বছরের উন্নয়ন মুছে গেছে।
এদিকে যুদ্ধবিরতির মধ্যেই গাজায় গতকাল রোববার ইসরায়েলের একাধিক বিমান হামলায় আরও তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গত বছর অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর থেকে এ পর্যন্ত সেখানে ইসরায়েলি হামলায় ৪২০ ফিলিস্তিনি নিহত ও ১১৮৪ জন আহত হয়েছেন। খবর আলজাজিরা ও আনাদোলু এজেন্সির।