মানচিত্র, ভিডিও ও ছবি: যেভাবে মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা হলো

Date: 2026-01-04
news-banner

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে শনিবার গ্রেপ্তারের পর ফৌজদারি অপরাধের বিচারের মুখোমুখি করার জন্য নিউইয়র্কে নেওয়া হয়েছে। তাঁকে গ্রেপ্তার অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে, ভেনেজুয়েলা সরকারের ভেতরে সিআইএ সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষ ছিল। তাদের সহায়তায় মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অভিযানের বাহিনী। সরকারের ভেতরে থাকা পক্ষটি গত কয়েকদিন ধরে মাদুরোর অবস্থানে নজর রেখেছিল।

প্রাথমিক হামলা
স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত আনুমানিক ২টার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলের একাধিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এসব হামলার মধ্যে রাজধানী কারাকাসও ছিল। উদ্দেশ্য ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করা এবং মার্কিন হেলিকপ্টারগুলোর জন্য পথ সুগম করা। হামলার প্রতিক্রিয়ায় ভেনেজুয়েলা সরকার দেশজুড়ে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে।

কারাকাসের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বিশাল সামরিক ঘাঁটি ফুয়ের্তে তিউনায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। ভেনেজুয়েলার শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব ও অনেক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তার অবস্থান এই ঘাঁটিতে। ধারণা করা হচ্ছিল প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোও সেখানে ছিলেন। শনিবার ভোরে তোলা একটি ছবিতে দেখা যায়, আশপাশের একাধিক স্থাপনায় হামলার পর সামরিক ঘাঁটিটিতে আগুনে জ্বলছে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, কারাকাসের লা কার্লোটা বিমানবন্দরের কাছে বিস্ফোরণের শব্দের সঙ্গে সঙ্গে আকাশে ঘন ধোঁয়া উঠছে। এছাড়া প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও যাচাইকৃত ভিডিও ফুটেজ থেকে জানা গেছে, লা গুয়াইরা বন্দর এবং হিগুয়েরো বিমানবন্দরেও হামলা চালানো হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রাথমিক তথ্য তুলে ধরে ভেনেজুয়েলার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এসব হামলায় বেসামরিক নাগরিক ও সেনাসদস্যসহ অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন।

মাদুরোকে আটক
যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, শুক্রবার রাত ২টা ১ মিনিটে মার্কিন বাহিনী মাদুরোর কম্পাউন্ডে পৌঁছায় এবং শনিবার ভোর ৪টা ২৯ মিনিটে ‘অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে’ তারা আবার সমুদ্রপথে ফিরে যায়।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কারাকাসে আগুন জ্বলছে এবং হেলিকপ্টারগুলো ফুয়ের্তে তিউনার দিকে নামছে। ভিডিওটি স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত ১টা ৫৮ মিনিটে ধারণ করা হয় বলে জানা গেছে।

শনিবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, এই অভিযানে কোনো মার্কিন সেনা নিহত হননি এবং কোনো সামরিক সরঞ্জামেরও ক্ষতি হয়নি। তবে দুটি সামরিক সূত্র জানায়, অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ছয়জন সেনা আহত হয়েছেন।

মানচিত্রে মাদুরো আটক ও স্থানান্তরের স্থান। নিউইয়র্ক টাইমসের সৌজন্যে

ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে প্রথমে ক্যারিবীয় সাগরে টহলরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আইও জিমায় নেওয়া হয়। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার সেন্টিনেল-২ স্যাটেলাইটে তোলা একটি ছবির ভিত্তিতে জানা যায়, শুক্রবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টার দিকে আইও জিমা নামের জাহাজটি ভেনেজুয়েলার উপকূল থেকে প্রায় ১০০ মাইল দূরে অবস্থান করছিল।

মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আইও জিমা। ফাইল ছবি: এএফপি

জাহাজটির সঙ্গে নৌবাহিনীর অন্তত আরও সাতটি জাহাজ ছিল। এর মধ্যে এমভি ওশান ট্রেডার নামের একটি জাহাজ ছিল, যা বিশেষ অভিযানের ‘মাদারশিপ’ হিসেবে হেলিকপ্টার, ছোট নৌযান ও ড্রোন মোতায়েন করতে সক্ষম। আরও চারটি জাহাজে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজিত ছিল।

গ্রেপ্তারের পর মাদুরো দম্পতিকে কিউবার গুয়ান্তানামো বে-তে অবস্থিত মার্কিন নৌঘাঁটি হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়। সেখানে এফবিআইয়ের একটি বোয়িং ৭৫৭ সরকারি উড়োজাহাজ রানওয়েতে প্রস্তুত ছিল। সেখান থেকে তাদের নিউইয়র্ক সিটির উত্তরে অবস্থিত স্টুয়ার্ট এয়ার ন্যাশনাল গার্ড বেসে নেওয়া হয়।

আটক কেন্দ্রে স্থানান্তর
শনিবার বিকেলে নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়ায় আনা হয়। তাঁর গতিবিধি সম্পর্কে অবগত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে নিউইয়র্ক টাইমস। তবে তিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি। ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় শনিবার সন্ধ্যা ৭টার ঠিক আগে মাদুরোকে হেলিকপ্টারে করে ম্যানহাটনে নেওয়া হয়। সেখান থেকে গাড়িতে করে স্থানান্তর করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ)-এর নিউইয়র্ক সিটি সদরদপ্তরে।

এরপর ম্যানহাটন থেকে হেলিকপ্টারে করে মাদুরোকে ব্রুকলিনে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে গাড়িতে করে মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, আপাতত সেখানেই তাঁকে আটক রাখা হবে।

নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টে দায়ের করা নতুন অভিযোগপত্রে মাদুরোর বিরুদ্ধে ‘নার্কো-সন্ত্রাসবাদ’ এবং কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর আগে ২০২০ সালে, ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের সময়ও একই অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। মাদুরো কবে প্রথমবারের মতো আদালতে হাজির হবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য জানানো হয়নি।

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News