বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টা। কালুরঘাট সেতুর পূর্বপাড়ে বোয়ালখালী অংশে পার হওয়ার অপেক্ষায় গাড়ির লম্বা সারি। শীতের ঠান্ডা হাওয়ায় গায়ে শাল জড়ানো বৃদ্ধ আবদুল হাকিম একটি দোকানে চা খাচ্ছিলেন। গাড়ির সেই লম্বা সারির দিকে তাকিয়ে তিনি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘প্রতিবার যারা প্রার্থী অয়, তারা কত হথা হয়। হথা দে যে, নোয়া সেতু গরি দিবু। কিন্তু এমপি অনোর পর সেতুর হথা ভুলি যায়। আল্লাহ জানে, হত্তে এই সেতু অইবো!’
আবদুল হাকিমের আক্ষেপ থেকেই বোঝা যায়, নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে প্রার্থীরা ভোটারদের সামনে কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের ‘মুলা’ ঝুলিয়ে রাখেন। এবারের নির্বাচনেও চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনে ভোটারদের মন জয়ের বড় ‘মন্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছেন কর্ণফুলী কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের ইস্যুকে।
কর্ণফুলী নদীর দুই পারের বোয়ালখালী ও শহরের একাংশ নিয়ে চট্টগ্রাম-৮ আসন গঠিত। এবার এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদউল্লাহ, জামায়াতের ডা. আবু নাছের ও এনসিপির জোবাইরুল ইসলাম আরিফ। এরশাদউল্লাহ সমকালকে বলেন, ‘কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণ এলাকার সবচেয়ে বড় ইস্যু। আমি নির্বাচিত হলে কালুরঘাটে নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করাই হবে প্রথম কাজ।’ ডা. আবু নাছের বলেন, ‘গণসংযোগে গেলে এলাকার মানুষ কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের বিষয়টি জানতে চান। নির্বাচিত হলে আমার প্রথম ও প্রধান কাজই হবে কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের মাঠ পর্যায়ের কাজ দ্রুত শুরু করা।’
গত ১৪ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস থেকে সেতুটির নির্মাণকাজ উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে নতুন সেতুর কাজ শুরু হয়ে ২০৩০ সালে সেতু দিয়ে যান চলাচল করার কথা রয়েছে।
একটি নতুন কালুরঘাট সেতুর স্বপ্ন কাঁধে নিয়ে পরপর পরপারে চলে গেছেন দুইজন সংসদ সদস্য। তারা হলেন জাসদের সাবেক কার্যকরী সভাপতি মইনউদ্দীন খান বাদল এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমদ। কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণে মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু করা না হলে সংসদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন মইনউদ্দীন খান বাদল।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকে কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের বিষয় সামনে আসে। এ সেতু নির্মাণের দাবিতে দীর্ঘদিন ‘বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন পরিষদ’-এর ব্যানারে আন্দোলন করে যাচ্ছেন এলাকার মানুষ।
বোয়ালখালীর ধোরলা গ্রামের কালাইয়ারহাট এলাকার বাসিন্দা আবু ছিদ্দিক বলেন, ‘দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর একটানা ক্ষমতা ধরে রেখেছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার। তাদের এমপিরা মুখে কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের কথা বললেও কাজ কিছু করেননি।’ সারোয়াতলীর বাসিন্দা, পল্লিচিকিৎসক দিদারুল আলম বলেন, ‘গ্রামের বাড়িতে বসবাস করলেও নানা কারণে আমাকে প্রায় সময়ই শহরে যেতে হয়। কিন্তু কালুরঘাট সেতু পার হওয়া মানেই একটি যুদ্ধ।’ অটোরিকশা চালক আবদুর রহিম বলেন, ‘কালুরঘাট সেতু একমুখী হওয়ায় ভোগান্তি পোহাতে হয়। কক্সবাজার রেললাইন চালু হওয়ার পর ট্রেন চলাচল বেড়েছে। এতে বাড়তি সময় অপেক্ষা করতে হয়। এর ফলে ভোগান্তি আরও বেড়েছে।’
কালুরঘাট সেতু টোল ম্যানেজার মো. খোরশেদ আলম বলেন, ‘দিনে চারবার সেতু দিয়ে ট্রেন পারাপার হয়। একবার ট্রেন পারাপারের সময় সেতুর দুই প্রান্তে যান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। এতে আধ ঘণ্টা বাড়তি সময় লেগে যায়।’