ইরানের বিক্ষোভের লক্ষ্য রাজনৈতিক নয় অর্থনৈতিক

Date: 2026-01-04
news-banner

পশ্চিমা বিশ্বের অনেকেই ইরানি রিয়ালের রেকর্ড পতন এবং তেহরানের বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়াকে সংকীর্ণ ও গতানুগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করছেন। ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবে যে বয়ান ঠেলে দেওয়া হচ্ছে তা হলো, ‘সরকার এখন ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে’, যেখানে অর্থনৈতিক ব্যর্থতা সম্পূর্ণ পতনের পূর্বসূরি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে অন্যান্য সহকর্মীর সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতালব্ধ গবেষণা আরও জটিল বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।

আমরা যা দেখছি তা কোনো রাজনৈতিক বিপ্লব নয়, বরং এক সমাজের মরিয়া দীর্ঘশ্বাস, যার অর্থনৈতিক বাফার মধ্যবিত্ত শ্রেণি পরিকল্পিতভাবে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার অমানবিক ও শাস্তিমূলক নীতির কারণে ফাঁকা হয়ে গেছে। এই অর্থনৈতিক মৃত্যুর নেপথ্যে মূল চালিকাশক্তি কোনো গোপন বিষয় নয়। বিশ্বব্যাপী আর্থিক ব্যবস্থার ওপর মার্কিন হস্তক্ষেপ, ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের প্রচারণা এবং ইরানের তেল রপ্তানিকে লক্ষ্য করে প্রত্যেক ইরানি শিক্ষক, নার্স ও ছোট ব্যবসায়ীর সারাজীবনের সঞ্চয়ের ওপর মারাত্মক আঘাত হেনেছে।

২০১২ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সিন্থেটিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করে আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের মধ্যবিত্ত শ্রেণির আকার বার্ষিক গড়ে ১৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এটি কেবল অর্থনৈতিক চাপ ছিল না; পরিকল্পিতভাবে একটি কাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞ। লাখ লাখ মানুষ যারা এক সময় ইরানি সমাজের স্থিতিশীল মধ্যবিত্ত গঠন করেছিল, তাদের আজ ‘নতুন দরিদ্র’ শ্রেণিতে নামিয়ে আনা হলো। যখন অ্যান্টিবায়োটিক থেকে শুরু করে খাদ্যের প্রধান জিনিসপত্র বিলাসবহুল হয়ে ওঠে, তখন সামাজিক চুক্তি কেবল চাপের মুখে পড়ে না, বরং এই বাইরের শক্তি দ্বারা ভেঙে যায়।
এই অর্থনৈতিক অবরোধ একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক চাপের অংশ।

ইসরায়েলের সঙ্গে আঞ্চলিক ছায়াযুদ্ধ চলমান, যা ইরানের মাটিতে হত্যাকাণ্ড এবং ২০২৫ সালের জুনে দেশটির বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরাসরি সামরিক আক্রমণ চালিয়েছে। আর এই ছায়াযুদ্ধের কারণে ইরান রাষ্ট্রকে স্থায়ীভাবে নিজেদের ‘নিরাপত্তা-অগ্রাধিকার’ দিতে বাধ্য করেছে। আমি ইরানের অর্থনীতির সামরিকীকরণের ওপর গবেষণা করেছি। এতে বলেছি, এই বহিরাগত হুমকিগুলো ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা’র আড়ালে অবশিষ্ট সম্পদ দখল করতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার জন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত বলয়গুলোকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। এই বহিরাগত আগ্রাসন সংস্কারকে সহজতর করে না; তাদের গলা টিপে ধরে। 

তদুপরি ইসরায়েলের মোসাদের সাম্প্রতিক প্রকাশ্য বিবৃতি, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে তারা ‘মাঠের তৎপরতা’য় বিক্ষোভকারীদের সমর্থন করছে। তাদের এই দাবি কেবল ইরানি জনগণের প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষোভের প্রকাশকে অন্যায্য করে তোলে। এ ধরনের হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য সবচেয়ে যুদ্ধবাজ উপাদানগুলো ব্যবহারের দুয়ার খুলে দেয়। আর অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলে একটি জনপ্রিয় দাবির ভিত্তিতে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ দেয়। ফলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা এবং অর্থনৈতিক অবরোধের পক্ষে ন্যায্যতা আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়। 
পশ্চিমা নীতিনির্ধারকরা প্রায়ই ধরে নেন, যদি আপনি কোনো সমাজকে যথেষ্ট জোরে চাপ দেন, তাহলে তা একটি পরিষ্কার শাসকের পরিবর্তন ঘটাবে। দুই দশকের তথ্য ব্যবহার করে আমার এক যৌথ গবেষণায় দেখিয়েছি, এটি ঠিক নয়। আমরা দেখেছি, ব্যাপক আকারে নিষেধাজ্ঞা আসলে সংঘটিত গৃহযুদ্ধ ও অভ্যুত্থানের ঝুঁকি কমিয়ে আনে। এর আংশিক কারণ বহিরাগত শত্রুদের বিরুদ্ধে তখন জাতীয়তাবাদী আবেগ দানা বাঁধে, একই সঙ্গে নাগরিক বিশৃঙ্খলা ও সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়।

নিষেধাজ্ঞার ফল নতুন সরকার গঠনের দিকে যায় না; বরং এতে সমাজ আরও বিভক্ত ও অনিরাপদ হয়ে পড়ে। যখন একজন নাগরিক দেখতে পায়, মুদ্রার মূল্য অর্ধেক কমে যাচ্ছে এবং পদ্ধতিগত দুর্নীতির খবর বেরিয়ে পড়ছে, তখন বিদ্রোহের অপরচুনিটি কস্ট প্রায় শূন্যে নেমে আসে। একটি অত্যন্ত সংযুক্ত ডিজিটাল সমাজে এসব বৈষম্য লুকানো অসম্ভব হয়ে পড়ে, যেমনটি আমরা আমাদের সাম্প্রতিক প্রকাশনায় তুলে ধরেছি। ‘দরিদ্র মধ্যবিত্ত’ এখন প্রতিমুহূর্তে তাদের নিজের ও অভিজাতদের মধ্যকার দুর্ভোগের দূরত্ব এবং নিষেধাজ্ঞার ফলে সৃষ্ট অর্থনীতি থেকে লাভবান অভিজাত শ্রেণি– এই চিত্র দেখতে পাচ্ছে।  

ইরানি জনগণের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আহ্বান এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার জন্য পশ্চিমা আকাঙ্ক্ষার মধ্যে পার্থক্য করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে রাস্তায় থাকা ইরানিরা তাদের দেশকে ভেঙে ফেলার দাবি করছে না; তারা তাদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং তাদের জীবনকে ধূলিসাৎ করে দেওয়া সম্মিলিত শাস্তির অবসানের দাবি তুলেছে। 
বর্তমান মার্কিন-ইসরায়েলি কৌশলের ট্র্যাজেডি হলো এটি সমাজের সেই মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ধ্বংস করে দিয়েছে, যারা স্থিতিশীলতা ও সংস্কারের জন্য সবচেয়ে জোরালো শক্তি এবং সংঘাতপূর্ণ ভবিষ্যতের দিকে কমই এগিয়ে যেতে সক্ষম। মধ্যবিত্ত শ্রেণির এই কেন্দ্রটি দুর্বল করে বহিরাগত শক্তিগুলো উচ্চ দুর্নীতির মতো অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি মধ্যপন্থি বাফারকে সরিয়ে দিয়েছে, যা সাধারণত বিশৃঙ্খল সহিংসতার চেয়ে ক্রমবর্ধমান পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেয়।

মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগান: জার্মানির ফিলিপস-ইউনিভার্সিটি মারবার্গের সেন্টার ফর
নিয়ার অ্যান্ড মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজের (সিএনএমএস) অর্থনীতির অধ্যাপক; মিডলইস্ট আই থেকে
ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News