ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনেও বিশ্ব নীরব কেন?

Date: 2026-01-04
news-banner

মার্কিন সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্স ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে রাজধানী কারাকাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গেছে। শনিবার নিজের মালিকানাধীন ট্রুথ সোশ্যালে এক বিবৃতিতে এ কথা জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে মাদুরোকে কীভাবে ধরা হয়েছে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। ভেনেজুয়েলার সরকারও তা পরিষ্কার করেনি।

শনিবার স্থানীয় সময় রাত ১টা ৫০ মিনিটে ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এ সময় বিভিন্ন এলাকার মানুষ আতঙ্কে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, রাতে শহরের আলোঝলমলের মধ্যে আকাশে দুটি ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে। অন্য একটি স্থানে আলোর ঝলকানির পরপরই বিকট শব্দ শোনা যায়। সিবিএস নিউজের খবর অনুসারে, ট্রাম্প নিজেই ভেনেজুয়েলার সামরিক স্থাপনাসহ দেশটির বিভিন্ন স্থানে হামলার নির্দেশ দিয়েছেন।

সর্বশেষ খবর হলো, মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্দি এক এক্স (টুইটার) বার্তায় জানিয়েছেন, মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের এক আদালতে তোলা হবে। তাদের বিরুদ্ধে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র দিয়ে সন্ত্রাস চালানোর মামলা হয়েছে।

এ ঘটনা ১৯৮৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের পানামা আক্রমণের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখনও মার্কিন সেনারা পানামার প্রেসিডেন্ট ম্যানয়েল নরিয়েগাকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের অভিযোগ তুলে ধরে নিয়ে যায়। মার্কিন আইন অনুসারে নরিয়েগার বিচার করে তারা। তবে সামরিক একনায়ক নরিয়েগা ছিলেন সিআইএর আশীর্বাদধন্য। মার্কিন নৌবাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পানামা খালের ওপর পানামার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চাইলে ওই ভাগ্য বরণ করতে হয় তাঁকে। অন্যদিকে মাদুরো বরাবরই মার্কিনবিরোধী হিসেবে পরিচিত। ভেনেজুয়েলায় বলিভারিয়ান বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী হুগো শ্যাভেজের উত্তরসূরি তিনি। 

ভেনেজুয়েলা বিশ্বের সর্বাধিক জ্বালানি তেলের ভান্ডারের অধিকারী। শ্যাভেজের আগে ওই তেল সম্পদের ওপর প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল যুক্তরাষ্টের। শ্যাভেজ সেগুলো জাতীয়করণ করেন এবং নিজেদের সম্পদের ওপর নিজেদের সম্পূর্ণ হিস্যা প্রতিষ্ঠিত করেন। ২০১৩ সালে শ্যাভেজের মৃত্যুর পর ক্ষমতা নিয়ে মাদুরো শ্যাভেজের সেই পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন।

তবে তেল বিক্রির টাকায় নানা সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচি চালিয়ে শ্যাভেজ যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, মাদুরো তা পারেননি। দুজনের সময়কার বিশ্ব পরিস্থিতি ভিন্ন হলেও, শ্যাভেজ তাঁর দক্ষতা ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে অন্তত লাতিন আমেরিকায় যে প্রভাব বিস্তার করেন, তা দেখাতে পারেননি মাদুরো। মাদুরো একের পর এক নির্বাচনে জালিয়াতির মাধ্যমে জয় পেয়েছেন বলে গোটা অঞ্চলেই জনশ্রুতি ব্যাপক। মোট কথা, প্রতিকূল বিশ্ব পরিস্থিতি এবং নিজ ও অঞ্চলের জনগণের মধ্যে পুর্বসূরি শ্যাভেজের জনপ্রিয়তা ধরে রাখায় ব্যর্থতাই মাদুরোকে এ হতাশাজনক পরিণতি বরণ করতে হলো।

ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ১৮২৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো প্রণীত ‘মনরো মতবাদ’-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে দক্ষিণ আমেরিকায় মার্কিন একচেটিয়া প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। ১৯০০ সালের গোড়ার দিকে আরেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের অধীনে সংঘটিত ‘বন্দুকযুদ্ধের কূটনীতি’-র কথাও এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায়। অর্থাৎ মার্কিন শাসকদের ঘোষণা অনুসারে, দক্ষিণ আমেরিকায় কোনো দেশেরই মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের সুযোগ নেই। কিউবার বিরুদ্ধে গত ৬৫ বছর ধরে চলমান মার্কিন অবরোধের কথা এ প্রসঙ্গে বলা যায়। উপরন্তু, ওই অঞ্চলের বেশির ভাগ দেশেই এখন মার্কিন প্রভাবাধীন ডানপন্থি সরকার প্রতিষ্ঠিত।

বিশ্ব পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বলা যায়, চীন ও রাশিয়া বরাবরই ভেনেজুয়েলার সঙ্গে থাকলেও এবং সেখানে তাদের বিনিয়োগ থাকলেও, দুই দেশের কেউই মার্কিন আগ্রাসনের পর্যায়ে নেই। চীন বরাবরই ব্যবসায়ী মনোভাবাপন্ন; ফলে তাইওয়ানের মতো চীনের লাগোয়া ভূখণ্ড ছাড়া অন্যত্র কোথাও বন্ধুর পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি তাঁর নেই। রাশিয়া ইউক্রেন নিয়ে ব্যস্ত, বলতে গেলে কিছুটা কাবুও। তাই রাশিয়ারও সরাসরি মাদুরোর  পক্ষে দাঁড়ানোর হিম্মত নেই।

কোনো বিশ্লেষক আন্তর্জাতিক আইনের এহেন সরাসরি ও বেপরোয়া লঙ্ঘনের বিপরীতে মার্কিন কংগ্রেস কী করে তা দেখার পক্ষপাতি। মার্কিন আইন অনুযায়ী, কেবল মার্কিন কংগ্রেসেরই যুদ্ধ ঘোষণা করার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। তদুপরি, কংগ্রেসে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তারা ‘আমেরিকা ফার্স্ট নীতি’র পক্ষে এবং মূলত বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে। তবে ট্রাম্প যা করেছেন তা বিশেষত ওপরে বর্ণিত মনরো ডকট্রিন ও রুজভেল্টের নীতি বিবেচনায় পুরো মার্কিন শাসকশ্রেণির স্বার্থ ধারণ করে। ফলে আলোচ্য ঘটনায় অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক আইনের ব্যত্যয় অধিকাংশ মার্কিন সিনেটর, কংগ্রেস সদস্য বিবেচনায় নেবে না।

সন্দেহ নেই, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন নগ্ন আগ্রাসন দেশে দেশে বিক্ষোভের জন্ম দেবে। তবে আপাতত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সেই বিক্ষোভেই ভেনেজুয়েলার জনগণের একমাত্র ভরসা।

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News