গাজায় তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’ দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ছোট একটি জায়গায় আটকে রেখেছে ইসরায়েল। রেখার পাশে গেলেই নির্বিচারে গুলি করে ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা হচ্ছে। ঝোড়ো আবহাওয়া, তীব্র শীতের মধ্যে সমুদ্রের তীর ঘেঁষে বালুময় এলাকায় ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন বাসিন্দারা। তাঁবুতে উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় ঢুকে পড়ছে পানি; শীতে চরম দুর্দশায় দিন পার করছেন বৃদ্ধ, শিশু, নারীসহ গণহত্যায় জীবিতরা।
টিআরপি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, উপত্যকার অর্ধেকের বেশি অঞ্চল ইসরায়েল ‘হলুদ রেখা’ দিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এ রেখার ভেতরে বড় ধরনের সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। আছে ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া যান। সেখান থেকে প্রায়ই ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ করা হয়। যুদ্ধবিরতির মধ্যে এ গোলাবর্ষণে প্রতিদিনই প্রাণহানি ঘটছে। গত ১০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এ পর্যন্ত হাজারের বেশিবার তা লঙ্ঘন করেছে ইসরায়েল।
আলজাজিরা জানায়, গত বৃহস্পতিবারও ইউসেফ আহমেদ নামের এক শিশুকে হত্যা করে ইসরায়েলি বাহিনী। জাবালিয়ার আল নাজলা এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। গত অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত চার শতাধিক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে। অনেক স্থানে রয়েছে অবিস্ফোরিত বোমাও।
গাজার সঙ্গে থাকা মিসরের সীমান্ত ক্রসিংটির পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ এখন ইসরায়েলের হাতে। দক্ষিণের খান ইউনিস শহরের বড় অংশ হলুদ রেখার ভেতরে চলে গেছে। অনেক স্থানে ভবন ধসিয়ে বুলডোজার দিয়ে তা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনিদের চাষাবাদযোগ্য জমির প্রায় সবটাই কথিত হলুদ রেখার ভেতরে। গাজা সিটির সুজাইয়া উপকণ্ঠ, আল তুফা, জইতুন এবং উত্তরে বাইত হানুন ও বাইত লাহিয়ার দখল নিয়েছে ইসরায়েল। বিশ্ব গাজায় যুদ্ধবিরতি দেখলেও বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল নিয়ে কেউ কথা বলছে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফার ভিত্তিতে গাজায় তিন ধাপের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। প্রথম ধাপে গাজায় থাকা সব জীবিত ও মৃত জিম্মির মুক্তি দেওয়ার শর্ত ছিল। এক মৃতদেহ ছাড়া বাকি সবাইকে ফেরত দিয়েছে হামাস। সে অনুযায়ী গাজার একাংশ ছাড়ে ইসরায়েল। কিন্তু তারা গাজা না ছেড়ে এর একটি বড় অংশ দখলে নিয়ে নেয়।
চুক্তির দ্বিতীয় ধাপটি ছিল হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও পুরো গাজা থেকে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহার-সংক্রান্ত। এ শর্তটির মধ্যেই সমস্যাটি নিহিত। গাজায় বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গ্রুপের বিচরণ দেখা যাচ্ছে। তাদের অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ করে ইসরায়েল। এ প্রেক্ষাপটে হামাস রাজি হচ্ছে না অস্ত্র রাখতে। দ্বিতীয় দফায় বিশ্বের নানা দেশের সামরিক বাহিনীর সদস্য নিয়ে গাজায় একটি নিরাপত্তা বাহিনী করার প্রতিশ্রুতি ছিল। ওই নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দিতে অনেক দেশই এখন অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।
এসব কিছু মিলিয়ে গাজায় দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি আটকে আছে। ফলে ইসরায়েলের গণহত্যামূলক হামলা বন্ধ হলেও স্বস্তি নেই ফিলিস্তিনিদের। নানা দুর্ভোগ-সংকটে দিন কাটছে তাদের। ইসরায়েলের হামলায় ৯০ শতাংশের বেশি স্থাপনা ধ্বংস হওয়ায় ত্রিপল দিয়ে তৈরি তাঁবুতে থাকতে হচ্ছে তাদের।
গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, প্রচণ্ড ঠান্ডায় মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে এক তরুণীর মৃত্যু হয়েছে। পৃথকভাবে গাজার ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্সও জানিয়েছে, গাজা সিটির ইয়ারমুক এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়কেন্দ্রে আগুন লাগার পর তারা এক মা ও শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করে। এ সপ্তাহের শুরুতে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সংস্থা (ইউনিসেফ) বলেছে, পর্যাপ্ত আশ্রয়ের অভাবে ডিসেম্বরে গাজায় কমপক্ষে পাঁচ ফিলিস্তিনি শিশু মারা গেছে।