সুনামগঞ্জের হাওরে বাঁধ সংস্কারের কাজে অগ্রগতি কম

Date: 2026-01-03
news-banner

সুনামগঞ্জের হাওরের প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার বোরো ফসল রক্ষায় বাঁধ সংস্কারের কাজ এবার কমপক্ষে দশ দিন পিছিয়েছে। অন্যান্য বছর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে হাওরে বাঁধের কাজের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও এবার সেটি হয়নি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, জাতীয় নির্বাচন, পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) গঠনে বিলম্ব এবং কর্মকর্তাদের বদলির কারণে হাওরে বাঁধের কাজে গতি আসছে না। 
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা জানান, গত ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাঁধের পিআইসি গঠনের অগ্রগতি ছিল হতাশাজনক। ৩০ ডিসেম্বর জেলা হাওররক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সভা থাকায় আগের দিন বিকেলে তড়িঘড়ি করে কিছু পিআইসি গঠন করে জেলা কমিটিতে পাঠান উপজেলা হাওর রক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সদস্যরা। সর্বশেষ জেলা হাওর রক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সভায় জানানো হয়েছে, জেলার ৭০১টি বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের মধ্যে ৬১৪টির জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে।

পাউবোসহ একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলার ১২ উপজেলার মধ্যে সদর উপজেলায় ১৭টি প্রকল্পের মধ্যে ১৬, বিশ্বম্ভরপুরে ২৩ প্রকল্পের মধ্যে ১৯, জামালগঞ্জে ৪১ প্রকল্পের মধ্যে সবকটি (৪১), তাহিরপুরে ৮৫ প্রকল্পের মধ্যে ৬৪, ধর্মপাশার ৯৩ প্রকল্পের সবকটি (৯৩), মধ্যনগরের ৪১ প্রকল্পের মধ্যে সবকটি (৪১), শান্তিগঞ্জের ৬৩টি প্রকল্পের মধ্যে ৪৩, জগন্নাথপুরের ৩৭ প্রকল্পের সবকটি (৩৭), দিরাইয়ের ১৩২ প্রকল্পের মধ্যে ১০৭, শাল্লার ১২৬ প্রকল্পের মধ্যে ১১৬, ছাতকের ২৫ প্রকল্পের মধ্যে ২৪, দোয়ারায় ১৭ প্রকল্পের মধ্যে ১৫টি’র পিআইসি গঠন করা হয়েছে। জেলা কমিটিতে মঙ্গলবার এগুলো অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। 

গত মঙ্গলবার জেলা হাওর রক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সভায় ৬১৪টি’র বাঁধের কাজের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন হয়েছে তথ্য দেওয়া হলেও এদিন পর্যন্ত মাত্র ১২১টিতে শুরু হয়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে হাওরের বাঁধের কাজের অগ্রগতি কম স্বীকার করে পাউবোর একজন প্রকৌশলী জানান, গত বছর ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২০০টি হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ শুরু হয়েছিল। 
শাল্লা উপজেলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বলেন, গেল বছর যেসব বাঁধে এই সময়ে ৩০-৪০ ভাগ কাজ 
শেষ হয়েছিল। এবার সেখানে এখনও মাটি পড়েনি। দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়া না হলে হাওরের বিপুল ফসল অকাল বন্যা থেকে রক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হবে। তিনি বলেন, যত আগে বাঁধের কাজ শুরু হবে, ততই কমপেকশন হয়ে বাঁধ শক্ত হবে। অসময়ে তৈরি বাঁধ দুর্বল হয়।
সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় গত রোববার পর্যন্ত ২৩ প্রকল্পের মধ্যে কেবল একটি পিআইসি গঠন হয়েছিল।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল মতিন খান বললেন, ‘১৫ ডিসেম্বরে একটি পিআইসি গঠন করে কাজ শুরু হয়েছিল। গত সোমবার বিকেলে আরও ১৮টি পিআইসি গঠন হয়েছে। 
আমি নতুন এসেছি, এজন্য একটু বিলম্ব হলেও সকলের সহযোগিতায় দ্রুত কাজ ওঠানোর চেষ্টা থাকবে আমাদের।’ 
জেলা সিপিবির সাবেক সভাপতি চিত্ত রঞ্জন তালুকদার বলেন, বাঁধের কাজ পেছানোর কিছু ‘ধান্দা-ফিকির’ থাকে। নির্বাচনের বছর এবার, অনেকের মনোযোগ ওদিকে নাও থাকতে পারে। এই সুযোগ যেন অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা না নেন। সেই খেয়াল রাখতে হবে। 
কৃষক সংগঠক সিরাজুল হক অলি বললেন, বাঁধের কাজ কিছুটা পিছিয়েছে এটা ঠিক। তবে এখনও যদি গুরুত্ব দিয়ে এগোনো যায়, সমস্যা হবার কথা নয়। 
সুনামগঞ্জে এবার বোরো চাষাবাদ হবে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে। প্রায় চার লাখ কৃষক পরিবারের চেষ্টায় তাতে ১৪ লাখ টন ধানের উৎপাদন হবার কথা। টাকার অঙ্কে এই ধানের দাম পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি।

উৎপাদিত ফসল রক্ষার জন্য ৯৫টি হাওরের ৭০১টি অংশে এবার হাওর রক্ষা বাঁধ মেরামত বা নতুন করে তৈরি হবে। পিআইসির মাধ্যমে এই প্রকল্পগুলোর কাজ বাস্তবায়নে ১৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে পাউবো। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। অর্থ ছাড় হয়েছে ২৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
বাঁধের কাজ দশ দিন পিছিয়েছে স্বীকার করে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের রদবদল ও পিআইসি গঠনে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। শুক্রবারের (আজ) মধ্যে সকল পিআইসি গঠন শেষে বাঁধের কাজ জোরেশোরে শুরু হবে। নির্ধারিত সময় ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে জেলার সব বাঁধের কাজ শেষ হবে।

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News