গাজায় যুদ্ধবিরতি হলেও মৃত্যু থেমে নেই
Date: 2026-01-03
গাজায় যুদ্ধবিমানের গর্জন কিংবা গোলাবর্ষণের ব্যাপক আওয়াজের চেয়েও আমরা ‘শান্তি’ শব্দটি বেশি শুনি। টেলিভিশনের পর্দায়, বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে বারবার এ শব্দটিই শুনতে পাই। প্রতিটি দেশই দাবি করে– তারা ফিলিস্তিনিদের জন্য শান্তি চায়। আমরা কি কখনও এক দিনের জন্যও সেই শান্তি অনুভব করেছি? বাস্তবতা হলো– না। গাজায় যুদ্ধবিরতি চলছে– অন্তত যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাসী তাই বলছে। গাজায় আমরা এটি অনুভব করতে পরছি না। ১০ অক্টোবর মিসরে শার্ম এল-শেখে ঘটা করে এই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। এর পর থেকে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ৩৬০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৭০ জন শিশু। চারপাশে বিস্ফোরণের শব্দ শুনে এখনও ঘর থেকে বের হতে ভয় পাই। আমরা যেন অপেক্ষার এক অন্তহীন ধাঁধায় আটকে আছি, যাতে যন্ত্রণা শেষ হয়; জীবনের নতুন সূচনা হয়; সর্বোপরি মৃত্যুর এই মিছিলের অবসান ঘটে।
বিশ্বনেতারা ‘পরবর্তী দিন’ নিয়ে আলোচনা করছেন। অথচ আমরা আছি যুদ্ধসৃষ্ট ভয় ও বিভ্রান্তিতে। যখন তারা শান্তি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছেন এবং আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করছেন, তখন আমরা পড়ে আছি অজানার অতল গহ্বরে। আমি ও আমার পরিবার এখন একটি ছোট, অনুপযুক্ত ভাড়া বাড়িতে কোনো রকমে বসবাস করছি। এখানে দৈনন্দিন জীবন ভীষণ কষ্টকর। পানি সরবরাহ সীমিত। এটিএম বুথ ঠিকভাবে কাজ না করায় নগদ টাকা পাওয়া কঠিন। সড়ক এতটাই বিধ্বস্ত যে, হাঁটা বা গাড়ি চালানো বিপজ্জনক। বিদ্যুৎ-ইন্টারনেট নেই। নিরাপত্তা নিয়ে সদা শঙ্কায়। অনেক পরিবার ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িতে বসবাস করছে, যেখানে মাথার ওপর থাকা ভবন যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে। তাদের বিকল্প উপায় নেই। তারা শুধু মাথা গোঁজার একটি ছাদ চায়, এমনকি যদি তা যে কোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়ে। এখন ডিসেম্বর। আমাদের অনেকের কোনো ঘর নেই; জীবন সীমাবদ্ধ তাঁবুতে। তাই কেউ কেউ আক্ষরিক অর্থেই শীতের কাদা-পানিতে।
আমি যখন অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির খবর শুনি, তখন আনন্দিত ও আশাবাদী হয়ে ভেবেছিলাম, এটিই যুদ্ধের শেষ আর নিরাপত্তা ও শান্তির নতুন জীবন শুরু হবে। ডিসেম্বরের শেষেও আমি সেই পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করছি। বাস্তবে যুদ্ধবিরতির শর্ত বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে, আর রাতে ঝরে পড়ছে অশ্রু। আমি আমার বাগদত্তাকে দেখার অপেক্ষায় আছি, যাকে গত দুই বছর ধরে দেখিনি। কারণ আমি থাকতাম গাজার কেন্দ্রে, সে দক্ষিণাঞ্চলে। সেখানে চলাচল অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল। সে ২০২৪ সালের এপ্রিলে মিসরে গিয়েছিল। এখন আর ঢুকতে পারছে না। আমিও বেরোতে পারছি না। এই যুদ্ধের আরও অনেক কিছুর মতো আমাদের আশাও বিলম্বিত। শান্তিতে প্রিয় মানুষের সঙ্গে থাকার জন্য আমাকে আরও অপেক্ষা করতে হবে। এটিই একজন ফিলিস্তিনির প্রকৃত যন্ত্রণা। অজানার জন্য অপেক্ষা এবং আশা আঁকড়ে ধরে রাখা। কখনও কখনও এটি মৃত্যুর চেয়েও যন্ত্রণাদায়ক মনে হয়।
এই মাসে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ প্রায় শেষের দিকে। দুর্ভাগ্যজনক, ফিলিস্তিনিদের জন্য এর কিছুই এখনও বাস্তবে রূপ নেয়নি। আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে আলোচনাগুলো হচ্ছে, সেখান থেকে আমাদেরই বাদ দেওয়া হয়েছে। যে সুন্দর গাজায় ফেরার স্বপ্ন দেখি, তা আর নেই। চোখের সামনে দেখি শুধু ধ্বংসস্তূপ আর যন্ত্রণা। আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বের একের পর এক এক বৈঠক এমন কিছু তৈরি করতে পারেনি, যা আমরা অনুভব করতে বা স্পর্শ করতে পারি।
আমরা নিজেদের জন্য শান্তির একটি রূপরেখা চাই, এমনকি এটি ভঙ্গুর কিংবা ভুল হোক। আমরা এখনও আশায় আছি, যদিও সে আশা ক্ষীণ। তারপরও আমরা তা আঁকড়ে ধরি; বেঁচে থাকার জন্য ক্ষণিকের সুখের মুহূর্ত খুঁজি। আমরা ছাই থেকে জীবন গড়ে তোলার চেষ্টা করি। কারণ ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশ লিখেছিলেন, ‘আমরা আশাকে রোগের মতো বহন করি আর সবকিছু গভীরভাবে অনুভব করি।’ শেষ পর্যন্ত দূর থেকে বিশ্ব যখন শান্তি নিয়ে বিতর্ক করে, তখন এগিয়ে চলার জন্য এই আশাই আমাদের একমাত্র সম্বল।
আয়া আল-হাত্তাব: ফিলিস্তিনের গাজার একজন লেখক; গার্ডিয়ান থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত
ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক