অনিশ্চয়তায় চার পরিবারের ভবিষ্যৎ
Date: 2025-12-31
শীতের রাতে মেঘনায় দুই লঞ্চের সংঘর্ষে জীবন থেমে গেছে ভোলার চার বাসিন্দার। তারা সবাই পেশায় শ্রমিক। দরিদ্র সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে কেউ ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেন, কেউ আসা-যাওয়ার মধ্যেই থাকেন। গতকাল শনিবার ভোলার দুই উপজেলায় দাফন হয়েছে তাদের। স্বজনেরা চোখের জলে বিদায় দিয়েছেন নিজ নিজ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে। তাদের আহাজারিতে উঠে এসেছে ভবিষ্যৎ জীবনের অনিশ্চয়তার কথা।
ভোলার ঘোষেরহাট থেকে ছেড়ে আসা ঢাকামুখী এমভি জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চটি বৃহস্পতিবার রাত ২টার পর চাঁদপুরের হাইমচর এলাকা অতিক্রম করছিল। এ সময় ঢাকা থেকে বরিশালগামী এমভি অ্যাডভেঞ্চার-৬ লঞ্চের সঙ্গে ওই লঞ্চের সংঘর্ষ হয়। এতে মারা যান লালমোহন উপজেলার বদরপুর ইউনিয়নের কাজিরাবাদ গ্রামের আবদুল গণি (৩৯), একই গ্রামের সাজু খাঁ (৪৫), কচুয়াখালী গ্রামের গজারিয়ার মোছা. রিনা বেগম (৩৫) ও চরফ্যাসনের আহমদপুর এলাকার মো. হানিফ মাঝি (৬০)।
আবদুল গণি ২০ বছর ধরে ঢাকায় রাজমিস্ত্রি সহকারী (জোগালি) হিসেবে কাজ করতেন।
১০-১২ দিন বাড়িতে কাটিয়ে বৃহস্পতিবার ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। একই এলাকার পাঁচজন দেউলা ঘাট থেকে এমভি জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চে ওঠেন। তাঁর সঙ্গেই ছিলেন সাজু খাঁ। দুজনই দুর্ঘটনায় মারা যান।
‘ওই লঞ্চ! বাবারে বাঁচাইয়া দিয়া যা’
শুক্রবার রাতেই তাদের লাশ ঢাকা থেকে ভোলায় আনা হয়। শনিবার সকাল ১০টায় কাজিরাবাদ গ্রামের নিজ বাড়ির পাশে বাবুল বিশ্বাস জামে মসজিদের সামনে আবদুল গণির জানাজা হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন হয়। এ সময় বাড়িতে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের দেখা মেলে। বাবাকে দাফন করে এসে গণির মেয়ে ময়না (১২) ঘরের সামনে বিলাপ করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে
ফেলছিল বারবার। চলতি বছরই স্থানীয় মাদ্রাসা থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে এই শিশুটি। তাকে বাবা কথা দিয়েছিলেন, ঢাকায়
গিয়ে সপ্তম শ্রেণির নতুন বই কেনার টাকা পাঠাবেন। আর কোনোদিনই সেই টাকা আসবে না–এই বাস্তবতার সামনে ভেঙে পড়েছে ময়না। জ্ঞান ফেরার পর চিৎকার করে শুধু সে বলছিল, ‘ওই লঞ্চ! আমি অহন কারে বাবা ডাকমু? ওই লঞ্চ! আমার বাবারে বাঁচাইয়া দিয়া যা।’
স্বামীকে শেষ বিদায় জানিয়ে আহাজারিতে ভেঙে পড়েন ময়নার মা লাইজু বিবিও। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে তিন সন্তানের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা জানাচ্ছিলেন। তাদের জন্য সরকারি সহায়তাও চান তিনি। স্বামীর এমন মৃত্যুর জন্য অ্যাডভেঞ্চার-৬ লঞ্চের চালককে দায়ী করে বিচারের ফরিয়াদ করছিলেন লাইজু।
থামছিল না আহাজারি
এই বাড়ির অদূরেই সাজু খাঁর বাড়ি। পেশায় তিনি বর্গাচাষি। তাঁর দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। ছোট মেয়ে রুপিয়ার বিয়ে দিতে গিয়ে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন সাজু। এ জন্য তিনি ঢাকায় রওনা হয়েছিলেন শ্রম বিক্রির উদ্দেশ্য নিয়ে। স্বজনেরা জানায়, মাঝেমধ্যেই তিনি ঢাকায় গিয়ে দিনমজুরি করতেন। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় স্থানীয় মান্নান মাস্টার বাড়ি জামে মসজিদের সামনে জানাজা হয় সাজু খাঁর। পরে মসজিদের কবরস্থানেই তাঁর দাফন হয়।
সাজু খাঁর বাড়ি থেকেও ভেসে আসছিল স্বজনের কান্না। কোনো সান্ত্বনাতেই আহাজারি থামানো যাচ্ছিল না তাঁর স্ত্রী মনোয়ারা বিবির। তিনি বলছিলেন, ‘পোলাইনসহ (সন্তান) আমারে সাগরে ভাসাইয়া কেন গেলা? আমি অহন কেমনে খাওয়ামু তোমার পোলাইনরে?’
এদিন বেলা ১১টায় কচুয়াখালী গ্রামের মোছা. রিনা বেগমের জানাজা হয় হাজিবাড়ি জামে মসজিদে। পরে পারিবারিক কবস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। রিনা ওই গ্রামের মো. মিলনের স্ত্রী। ঢাকার সাভারের একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন তিনি। অসুস্থ মেয়ে সাথীকে দেখতে সপ্তাহখানেক আগে তিনি বাড়ি আসেন। চিকিৎসা করিয়ে বৃহস্পতিবার রিনা ঢাকায় ফিরছিলেন। কথা দিয়েছিলেন, রোজার ঈদের সময় মেয়ের কাছে ফিরবেন। আর কখনও মেয়েকে ছাড়া ঢাকায় যাবেন না। সেই কথা যে এভাবে সত্যি হবে–স্বজনেরা ভাবতেও পারছেন না। মায়ের দাফন শেষে শোকাহত সাথী মায়ের মৃত্যুর জন্য লঞ্চচালককে দায়ী করে বিচার দাবি করে।
স্ত্রীর চিকিৎসা করানো হলো না
হানিফ মাঝির জানাজা শনিবার হয়েছে চরফ্যাসনের আহমদপুর ইউনিয়নের ফরিদাবাদ গ্রামের দালাল বাড়ি জামে মসজিদে। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। স্বজনেরা জানায়, হানিফের সংসারে চার সন্তান ও স্ত্রী রহিমা বেগম আছেন। মাছ শিকারই তাঁর পেশা। সম্প্রতি রহিমা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্থানীয় চিকিৎসায় সুস্থ না হওয়ায় ধারদেনা করে চিকিৎসার জন্য তাঁকে নিয়ে বৃহস্পতিবার ঢাকায় যাচ্ছিলেন হানিফ। বৃহস্পতিবার বিকেলে ঘোষেরহাট লঞ্চঘাট থেকে এমভি জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চে উঠেছিলেন। গভীর রাতে সন্তানদের কাছে হানিফ মাঝির মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছায়। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন রহিমাও।
কাজিরাবাদের সমাজকর্মী বাবুল বিশ্বাস বলেন, এ ঘটনার জন্য অ্যাডভেঞ্চার-৬ কর্তৃপক্ষ দায়ী। কুয়াশার মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের নৌযানগুলো যেন নিরাপদে চলাচল করতে পারে, এ জন্য সরকারের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানান। এ গ্রামের যে দুজন মারা গেছেন, তাদের পরিবার একেবারেই অসহায়। প্রশাসন ও বিত্তবান মানুষকে তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসা উচিত।
ভোলার জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান জানিয়েছেন, নিহত চারজনের দাফনের জন্য
জেলা প্রশাসন থেকে পরিবারকে ২৫ হাজার
টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তাদের পাশে থাকবে প্রশাসন।

