৪৫ শতাংশ দুর্ঘটনায় চালক পালিয়ে যান

Date: 2025-12-31
news-banner

নগরীর সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশ নাজুক। দুর্ঘটনায় নিয়মিত ঝরছে তাজা প্রাণ। বাস-ট্রাকই প্রধান ঘাতক। চরম ঝুঁকিতে যাত্রী ও পথচারীরা। প্রতিবেদন ও সাক্ষাৎকার : আব্দুল্লাহ আল মামুন

চট্টগ্রাম নগরে প্রতি দুটি প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনার মধ্যে একটি ঘটছে হিট অ্যান্ড রান হিসেবে। অর্থাৎ দুর্ঘটনা ঘটিয়ে চালক ও যানবাহন পালিয়ে যাচ্ছে আর সড়কে পড়ে থাকছে মৃত কিংবা গুরুতর আহত মানুষ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সংঘটিত প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ৪৫ শতাংশই ছিল হিট অ্যান্ড রান।  এই তথ্য উঠে এসেছে গত ২৪ ডিসেম্বর প্রকাশিত ‘চট্টগ্রাম সিটি রোড সেফটি রিপোর্ট ২০২৫’-এ। 

 চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিট অ্যান্ড রান দুর্ঘটনার শিকারদের মধ্যে ৭৩ শতাংশই পথচারী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম শহরে সংঘটিত মোট ২৭৩টি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার মধ্যে ১২৪টি ঘটনায় চালক বা যানবাহনের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর চালক ঘটনাস্থল ত্যাগ করেছেন বলে ধারণা করা হয়। সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিট অ্যান্ড রান দুর্ঘটনার উচ্চহার শুধু চালকদের দায়িত্বহীনতাই নয়, বরং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রতিফলন।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হিট অ্যান্ড রান দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারাচ্ছেন পথচারীরা। ভারী যানবাহন বিশেষ করে ট্রাক, বাস ও মিনিবাস–এই ধরনের দুর্ঘটনার সঙ্গে বেশি জড়িত। ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে পথচারী মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
চট্টগ্রামের কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় হিট অ্যান্ড রান দুর্ঘটনার প্রবণতা বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বড়পোল মোড়, অলংকার মোড়, সিইপিজেড গেট, সিটি গেট এবং রেলস্টেশন এলাকার আশপাশে পথচারী নিহত হওয়ার ঘটনা বেশি ঘটছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধিকাংশ হিট অ্যান্ড রান দুর্ঘটনা ঘটছে রাতে ও ভোরের দিকে, যখন সড়কে নজরদারি কম থাকে এবং যানবাহনের গতি তুলনামূলক বেশি থাকে। তবে দিনের বেলাতেও ব্যস্ত সড়ক ও মোড়গুলোতে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্ঘটনার পর চালক পালিয়ে যাওয়ায় বিচার পাওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মামলা হলেও চালক শনাক্ত না হওয়ায় তদন্ত কার্যত থমকে থাকে। প্রতিবেদনে হিট অ্যান্ড রান দুর্ঘটনা কমাতে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে– শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে স্পিড ক্যামেরা স্থাপন, ভারী যানবাহনের জন্য কঠোর গতি নিয়ন্ত্রণ, রাতে পুলিশের টহল জোরদার এবং দুর্ঘটনার পর চালক পালালে দ্রুত শনাক্তে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা গ্রহণ।

৭ বছরে চট্টগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় ৬৬২ মৃত্যু :
ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস ইনিশিয়েটিভ ফর গ্লোবাল রোড সেফটির (বিআইজিআরএস) সহযোগিতায় প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরের সড়ক দুর্ঘটনা, আহত ও মৃত্যুর চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সাত বছরে চট্টগ্রামে মোট ৬১৬টি প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রাণ গেছে ৬৬২ জনের। একই সময়ে প্রতি এক লাখ জনসংখ্যায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুহার ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৭ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বেড়েছে প্রায় ২৯ শতাংশ। মোট নিহতের ৫৯ শতাংশ পথচারী।
সড়কে নিরাপদ নয় শিশুরাও : চট্টগ্রাম নগরের সড়কে শুধু বড়রাই নয়, শিশুরাও নিরাপদ নয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পথচারী হিসেবে সবচেয়ে বেশি গুরুতর আহত হয়েছে ১ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুরা। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গুরুতর আহত পথচারীদের মধ্যে শিশুদের অংশই সবচেয়ে বেশি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রামে মোট সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের ৫৯ শতাংশই পথচারী। যদিও শিশুদের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বয়সভিত্তিকভাবে আলাদা করে প্রকাশ করা হয়নি; তবে প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে– গুরুতর আহত পথচারীদের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে এক থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুরা। 
স্কুল-বাজার এলাকায় ঝুঁকি বেশি : জানা যায়, সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শিশুদের অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে স্কুল, বাজার, বাসস্টপ ও আবাসিক এলাকার আশপাশে-যেখানে যানবাহনের চাপ বেশি হলেও গতি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল এবং নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা সীমিত।

প্রতিবেদন বলছে, চট্টগ্রামের বহু এলাকায় ফুটপাত দখল হয়ে থাকায় শিশুরা বাধ্য হয়ে মূল সড়ক ব্যবহার করছে। আবার অনেক জায়গায় জেব্রা ক্রসিং, স্পিড ব্রেকার কিংবা স্কুল জোন চিহ্ন থাকলেও তা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিশু পথচারী দুর্ঘটনার একটি বড় অংশেই ভারী যানবাহন—বিশেষ করে ট্রাক, বাস ও মিনিবাস-জড়িত। এসব যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষে শিশুদের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা বেশি দেখা গেছে। পাশাপাশি দ্রুতগতির মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়িও শিশুদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
নগরের ইস্পাহানি মোড় এলাকায় একটি স্কুলে পড়েন আয়েশা সিদ্দিকা মিতুর সন্তান। তিনি বলেন,‘লালখানবাজার মোড়ে পারাপারের কোন ব্যবস্থা নেই। দ্রুতগতির গাড়ির সামনে হাত উঁচিয়ে সন্তানকে নিয়ে প্রায় প্রতিদিন সড়ক পার হতে হয়। এই সময় খুব ভয় লাগে।

কী সুপারিশ করেছে প্রতিবেদন
‘চট্টগ্রাম সিটি রোড সেফটি রিপোর্ট ২০২৫’ শিশু পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে-স্কুল ও বাজার এলাকাকে বিশেষ ‘স্কুল জোন’ ঘোষণা, এসব এলাকায় কঠোর গতি নিয়ন্ত্রণ, উঁচু জেব্রা ক্রসিং ও স্পিড হাম্প নির্মাণ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা, এবং অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত সড়ক নিরাপত্তা সচেতনতা কার্যক্রম।

 

পুরুষের মৃত্যু চার গুণ বেশি 

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাই দায়ী

চট্টগ্রামের সড়কে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় পুরুষের মৃত্যু নারীদের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। এর জন্য মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেশি দায়ী। কারণ মোটরসাইকেল আরোহীদের সিংহ ভাগই পুরুষ। সদ্য প্রকাশিত ‘চট্টগ্রাম সিটি রোড সেফটি রিপোর্ট ২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৮০ শতাংশই পুরুষ আর মাত্র ২০ শতাংশ নারী। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সী পুরুষরা। এই বয়সী জনগোষ্ঠী মূলত কর্মজীবী–যাদের প্রতিদিন জীবিকার প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় সড়কে থাকতে হয়। কেউ হেঁটে কর্মস্থলে যান, কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ আবার গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। সময়ের চাপ, দ্রুত পৌঁছানোর তাগিদ এবং ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন ব্যবহারের প্রবণতা এই বয়সী পুরুষদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, চট্টগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ পথচারী এবং ২১ শতাংশ মোটরসাইকেল আরোহী। এই দুই শ্রেণিতেই পুরুষের উপস্থিতি নারীদের তুলনায় অনেক বেশি। নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার না করা, দ্রুতগতিতে চালানো এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতাও এই ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
ভারী যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষ পুরুষদের মৃত্যুর আরেকটি বড় কারণ। তথ্য অনুযায়ী, ১৫ শতাংশ পথচারী ট্রাকের ধাক্কায় এবং ১০ শতাংশ বাস ও মিনিবাসের ধাক্কায় নিহত হয়েছেন। মোটরসাইকেল আরোহীদের ১৪ শতাংশের মৃত্যু ঘটেছে ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারী যানবাহনের ওজন, গতি ও চালকের সীমিত দৃষ্টিসীমা দুর্ঘটনা ঘটলে প্রাণহানির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই ঝুঁকির মুখে সবচেয়ে বেশি পড়ছেন কর্মজীবী পুরুষরা।
হিট অ্যান্ড রান (দুর্ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে যাওয়া) দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও পুরুষের মৃত্যুহার বেশি। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চট্টগ্রামে সংঘটিত প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ৪৫ শতাংশই হিট অ্যান্ড রান। এসব ঘটনায় নিহতদের বড় অংশই পুরুষ। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, রাতে বা ভোরে কর্মস্থলে যাতায়াত করা শ্রমজীবী পুরুষদের সড়কে উপস্থিতি বেশি থাকে, যখন নজরদারি কম এবং যানবাহনের গতি তুলনামূলক বেশি থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উচ্চ মৃত্যুহারের পেছনে সামাজিক বাস্তবতাও বড় ভূমিকা রাখছে। পুরুষরা সাধারণত নারীদের তুলনায় বেশি সময় বাইরে থাকেন, ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন বেশি ব্যবহার করেন এবং অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিধি মানার ব্যাপারে উদাসীন থাকেন। দ্রুত চলাচলের মানসিক চাপ এবং জীবিকার তাগিদে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
পুরুষ মৃত্যুর এই উচ্চহার শুধু একটি সড়ক নিরাপত্তা সমস্যা নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। কারণ নিহতদের বড় অংশই পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য। একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি জীবন কেড়ে নেয় না, বরং একটি পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়।

 

পথচারীর প্রধান শত্রু ভারী যান

২৫ শতাংশ মৃত্যু ট্রাক-বাসে

নগরীর সড়কে পথচারীদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে ভারী যানবাহন। বিশেষ করে ট্রাক ও বাস। সদ্য প্রকাশিত ‘চট্টগ্রাম সিটি রোড সেফটি রিপোর্ট ২০২৫’-এর তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চট্টগ্রামে পথচারী মৃত্যুর একটি বড় অংশই ঘটেছে ট্রাক, বাস ও মিনিবাসের সঙ্গে সংঘর্ষে। নগরীর ব্যস্ত সড়কে ভারী যানবাহন চলাচলের চাপ বাড়লেও সেই অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চট্টগ্রামে সংঘটিত প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত পথচারীদের মধ্যে ১৫ শতাংশ ট্রাকের ধাক্কায় এবং ১০ শতাংশ বাস ও মিনিবাসের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছেন। অর্থাৎ শুধু এ দুই ধরনের ভারী যানবাহনেই চট্টগ্রামে প্রতি চারজন পথচারী নিহতের একজনের বেশি মারা যাচ্ছেন। একই সময়ে ৯ শতাংশ পথচারী হালকা যানবাহন কার ও মাইক্রোবাসের সঙ্গে সংঘর্ষে এবং ৮ শতাংশ মোটরসাইকেলের ধাক্কায় নিহত হয়েছেন। বাকি দুর্ঘটনাগুলোতে অন্যান্য বা শনাক্ত না হওয়া যানবাহন জড়িত ছিল।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারী যানবাহনের ওজন ও গতি দুর্ঘটনার সময় পথচারীর জন্য মারাত্মক হয়ে ওঠে। ট্রাক বা বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়লে একজন পথচারীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম থাকে। এর সঙ্গে যোগ হয় চালকের সীমিত দৃষ্টিসীমা ও বড় যান নিয়ন্ত্রণের জটিলতা। বিশেষ করে শহরের ভেতরে কনটেইনারবাহী ট্রাক ও দূরপাল্লার বাস চলাচল পথচারীদের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে।

প্রতিবেদনে চট্টগ্রামের কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকাকে ভারী যানজনিত দুর্ঘটনার জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বড়পোল, লংকার, সিটি গেট, সিইপিজেড গেট, আরাকান রোড ও পোর্ট কানেক্টিং রোড এলাকায় ট্রাক ও বাস সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনার হার বেশি। এসব এলাকায় একদিকে ভারী যান চলাচলের চাপ, অন্যদিকে পথচারীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
ভারী যানবাহনের ঝুঁকি শুধু পথচারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল আরোহীরাও গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছেন। ২০২২ থেকে ২০২৪ সময়ে নিহত মোটরসাইকেল আরোহীদের ১৪ শতাংশই ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন। বাস ও মিনিবাসের সঙ্গেও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মৃত্যু ঘটেছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে মোটরসাইকেল চালকদের চট্টগ্রামের দ্বিতীয় সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
হিট-অ্যান্ড-রান দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও ভারী যানবাহনের ভূমিকা উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে সংঘটিত প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ৪৫ শতাংশই ছিল হিট-অ্যান্ড-রান, যার ৭৩ শতাংশ ঘটনায় নিহত হয়েছেন পথচারী। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই হিট-অ্যান্ড-রান ঘটনার বড় অংশেই ট্রাক ও বাস জড়িত থাকতে পারে। কারণ, দুর্ঘটনার পর ভারী যান সহজেই এলাকা ত্যাগ করতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে চালক শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামে পথচারী মৃত্যু না কমার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত সমস্যা কাজ করছে। শহরের ভেতরে ভারী যান চলাচলের জন্য কার্যকর সময়সূচি ও রুট নিয়ন্ত্রণ নেই। গতি সীমা থাকলেও তা বাস্তবে মানা হয় না। পর্যাপ্ত স্পিড ক্যামেরা ও নজরদারির অভাব রয়েছে, আর পথচারীদের জন্য নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা খুবই সীমিত। এর পাশাপাশি ট্রাফিক আইন প্রয়োগে দুর্বলতাও দুর্ঘটনা কমাতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
 ‘চট্টগ্রাম সিটি রোড সেফটি রিপোর্ট ২০২৫’ ভারী যানজনিত দুর্ঘটনা কমাতে একাধিক সুপারিশ করেছে। প্রতিবেদনে শহরের ভেতরে ট্রাক ও ভারী যান চলাচলের নির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণ, উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গতি সীমা কঠোরভাবে কার্যকর করা, উঁচু ক্রসওয়াক ও পথচারী দ্বীপ নির্মাণ, ফুটপাত উন্নয়ন এবং স্পিড ক্যামেরাসহ নিয়মিত পুলিশ নজরদারি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া চালকদের দ্রুত শনাক্তে প্রযুক্তি ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সুপারিশ দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হলে চট্টগ্রামের সড়কে পথচারীদের মৃত্যু কমানো কঠিনই থেকে যাবে।

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News