মিয়ানমারের নির্বাচনে চীনা সমর্থনের কারণ

Date: 2025-12-31
news-banner

পাঁচ বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এ সময় ওয়াশিংটন থেকে ভোটার শিক্ষা কর্মসূচিতে সহায়তা দেওয়া হয়, বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব মোকাবিলার নামে নাগরিক সমাজকে সমর্থন করা হয়েছিল। এটি ছিল মিয়ানমারের কয়েকটি সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মধ্যে একটি। ১৯৪৮ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি মূলত সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে। ভোটাররা বেসামরিক নেতা অং সান সু চিকে জয়ী করে। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই জেনারেলরা আবার ক্ষমতা দখল করে এবং ওয়াশিংটন দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সংকুচিত করে।

রোববার থেকে ভোটাররা ভোট দিতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে মিয়ানমারে নির্বাচনী মৌসুম ফিরে এসেছে। এই ভোটে জান্তাবিরোধী অনেক রাজনীতিবিদ নেই এবং শুধু সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় তা অনুষ্ঠিত হবে। জাতিসংঘ এটিকে প্রহসন বলে আখ্যা দিয়েছে। তবে আশ্চর্যজনক হলেও জান্তার একটি সমর্থক হলো চীন, যা একদলীয় রাষ্ট্র।

বেইজিংয়ের জন্য মিয়ানমার ভারত মহাসাগরের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। চীন ছোট প্রতিবেশী দেশটিতে মহাসড়ক ও একটি গভীর সমুদ্রবন্দরসহ অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের তহবিল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু ২০২১ সালের অভ্যুত্থান এবং এর ফলে মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধের ফলে সেই পরিকল্পনাগুলো হুমকির মুখে পড়ে। গত বছর এক গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতিতে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই মিয়ানমারকে যুদ্ধের অবসান এবং ‘জনগণের ইচ্ছার ভিত্তিতে জাতীয় শাসন’ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।

ভোটার তালিকা তৈরির জন্য চীন জান্তাকে প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং তহবিল জোগানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একদলীয় রাষ্ট্র নির্বাচন প্রচারের বিড়ম্বনা পর্যবেক্ষকদের কাছে হার মানছে না। বেইজিংয়ের চোখে এই নির্বাচন মিয়ানমারে একটি আধা-বৈধ সরকার প্রতিষ্ঠার সর্বোত্তম উপায়। যার সঙ্গে কিছু দেশ দাঁতে দাঁত চেপে হলেও আলোচনা করতে রাজি হতে পারে। নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠানো মুষ্টিমেয় দেশগুলোর মধ্যে আছে– চীন, বেলারুশ ও রাশিয়া।

ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের চায়না প্রোগ্রামের পরিচালক ইউন সান বলেছেন, ‘এটি ভাবা খানিক মজার ব্যাপার, চীনারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন পরিচালনা করার চেষ্টা করছে।’ কিন্তু এটি কেবল এই নির্বাচনকে যতটা সম্ভব সুন্দর এবং বৈধ দেখানোর জন্য চীনা প্রচেষ্টার প্রমাণ–যোগ করেন তিনি।
বেইজিং তার স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য যুদ্ধরত জান্তা এবং বিদ্রোহী সেনাবাহিনী উভয়কেই অস্ত্র সরবরাহ করেছে। কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর তাদের প্রভাব ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর কাছে অঞ্চল ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। এখন তারা আশা করছে, নির্বাচনের ফলে স্থিতিশীলতার আভাস মিলবে, যা মিয়ানমারের উপকূলে তার স্থবির গভীর সমুদ্রবন্দর এবং তেল ও গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করবে। এই প্রকল্পগুলো গড়ে তোলার উদ্দেশ্য ছিল মালাক্কা প্রণালির ওপর চীনের নির্ভরতা কমিয়ে আনা। বেইজিংয়ের আশঙ্কা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো এক দিন এখানে অবরোধ করতে পারে।

মিয়ানমারের পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান হলেন কো কো গি, যিনি গণতন্ত্রপন্থিদের মধ্যে অন্যতম। চীনা কর্মকর্তারা গত বছর বেইজিংয়ে তাঁকে বলেছিলেন, ‘মিয়ানমারের শান্তি ও স্থিতিশীলতা সরাসরি চীনের স্বার্থ প্রভাবিত করে।’ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিয়ানমারে ‘শিক্ষা সফর’-এর জন্য আমন্ত্রিত অনেকের মধ্যে তাঁর রাজনৈতিক দলটিও একটি ছিল। তিনি বলেন, চীন স্পষ্টতই তার নিজস্ব স্বার্থের জন্য কাজ করছে। তা ছাড়া এটি ‘ঘনিষ্ঠ, প্রভাবশালী এবং যুক্ত হতে আগ্রহী, যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও সমস্যার মুখোমুখি।’ 

তিনি বলেন, ‘ওয়াশিংটন মূল্যবোধের কথা বলে; কিন্তু বেইজিং নিয়ে আসে সুবিধা।’ ‘এ জন্যই মিয়ানমার চীনের দিকে ঝুঁকে থাকে। কারণ আমেরিকা প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বড় বড় কথা বলে।’ তবে ভোট কেবল জান্তানিয়ন্ত্রিত এলাকায়, অথবা দেশের অর্ধেকেরও কম এলাকায় নেওয়া হবে। কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠীর পাশাপাশি গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলন, জাতীয় ঐক্য ছায়া সরকার  নির্বাচন বয়কটের আহ্বান জানিয়েছে।
নির্বাচনের ফলে একটি নামমাত্র বেসামরিক সরকার ফিরে আসতে পারে অথবা সামরিক অভিজাতদের মধ্যে পরিবর্তন আসতে পারে; যদিও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তখনও ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করবে। আর নির্বাচনের পর জান্তাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং কী ভূমিকা পালন করবেন, তা এখন বলা অনিশ্চিত।

আন্তর্জাতিক নিউইয়র্ক টাইমস: ডেকান হেরাল্ড থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News