হ‍্যালোউইনের কোমল রোদ

Date: 2026-02-06
news-banner
ক্যালিফোর্নিয়ার প্রকৃতি মূলত পাহাড় পর্বতের সমন্বয়ে গঠিত। উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় শ্বেতশুভ্র বরফ জমে চকচক করছে। পাহাড়ের শীর্ষ থেকে অসংখ্য জলধারার রেখাচিহ্ন নিচে নেমে গেছে। কোথাও কোথাও ছোট-বড় হ্রদের মতো জলাধার। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যের মধ্যে ডুবে গিয়ে কোনো এক সময় সান ফ্রান্সিসকো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করলাম।
যেহেতু অভ্যরন্তরীণ ফ্লাইট তাই ইমিগ্রেশনের ঝামেলা ছাড়াই বাইরে বেরিয়ে এলাম। লিফট ডেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে আমাদের হোটেলে পৌঁছে গেলাম।
সান ফ্রান্সিসকো এসেছি মূলত হৃদরোগবিষয়ক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশ নিতে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের চার দিনব্যা পী মেলা। বিভিন্ন বিষয়ে সবার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান বিনিময় করা, হৃদরোগের সর্বাধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং বিভিন্ন ধরনের গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করে নিজেদের সমৃদ্ধ করাই আমাদের উদ্দেশ্য।
তবে মূল উদ্দেশ্য সাধনের পাশাপাশি বিচিত্র প্রকৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রা সব সময় আকৃষ্ট করে। এবারও ব্যতিক্রম হলো না। ছোট ভাই লাবু সপরিবারে দীর্ঘকাল ধরে সান ফ্রান্সিসকো শহরের সন্নিকটে বিশ্বখ্যাত সিলিকন ভ্যালিতে বসবাস করে। সে একজন সাহিত্যুপ্রেমী ও কবি। তবে সে যে একজন চিত্রশিল্পীও তা জানা ছিল না। সে, তাঁর স্ত্রী সাহানা এবং তিন ছেলের আতিথেয়তার অত্যাযচারে জর্জরিত হয়ে সান ফ্রান্সিসকোর ভ্রমণ অত্যন্ত সুখকর এবং স্মরণীয় হয়ে থাকল। ছোট ভাই আগে থেকেই আমার রুচি এবং মনের চাহিদা সম্পর্কে অবগত ছিল। তাই আমি যখনই সময় বের করতে পেরেছি তখনই সে আমাদের নিয়ে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে পৌঁছে গেছে। সান ফ্রান্সিসকোর জগৎ সেরা গোল্ডেন গেট ব্রিজ, বে ব্রিজ, সিলিকন ভ্যালি, ফেসবুক, গুগল, অ্যাপেলসহ বিশ্বসেরা টেক জায়ান্টদের হেডকোয়ার্টার পরিদর্শন, প্রশান্ত মহাসাগরের গোধূলির অপরূপ রূপ মনের মতো পরিশোষণ করে ছুটির সময়টুকু পূর্ণ করে দিয়েছে। তবে সব থেকে ভালো লেগেছে প্রকৃতির কোলে নিজেদের সমর্পণ করে।  অক্টোবর মাসে এখানে হ্যা লোউইন উৎসব আমেরিকানদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় একটি উৎসব। আর হ্যালোউইন উৎসবের মূল আকর্ষণ হলো ছোট-বড় হাজার হাজার কুমড়োর মেলা। ১০০ গ্রাম থেকে শুরু করে ১০০ কেজির (তবে রেকর্ড ১১৬০ কেজি পর্যন্ত আছে) শতসহস্র কুমড়ো নানান বিন্যাজসে সাজিয়ে নানান ধরনের খাবার তৈরি করে এবং বিভিন্ন খেলাধুলার মাধ্যমে পুরো তল্লাট আনন্দমুখর হয়ে ওঠে। এটি মূলত আয়ারল্যা ন্ড, স্কটল্যান্ড ও উত্তর ফ্রান্সের সেল্ট সম্প্রদায়ের লোকদের উৎসব, যা প্রায় ২০০০ বছর ধরে চলে এসেছে। গেলিক ভাষায় ‘অল হ্যালোজ ইভ’ থেকে বিবর্তিত হয়ে হ্যালোইন নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে পবিত্র সন্ধ্যা। অক্টোবর মাসের ৩১ তারিখ থেকে নভেম্বর মাসের ১ তারিখ পর্যন্ত সময়ে সাধারণ মানুষেরা উৎসবে মেতে ওঠে। এটি গ্রীষ্মের শেষে ফসল কাটার মৌসুম। 
সেল্টদের বিশ্বাস যে, এই সময়ে মৃত আত্মারা পৃথিবীতে ফিরে আসে এবং জীবিত মানুষদের কাছাকাছি চলে আসে। মৃত আত্মাদের স্বাগত জানাতে জীবিত মানুষেরা ভূতপ্রেত সেজে নানান ধরনের কাজ করে থাকে। এই সময়ে ব্যা পক হারে কুমড়োর ফলন হয়ে থাকে এবং শতসহস্র কুমড়ো দিয়ে বাহারি খাবার তৈরি করা হয় এবং অতিথিদের মধ্যে পরিবেশন করা হয়। ছোট ভাই লাবু তার পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে আমাদের সিলিকন ভ্যালির মনোরম রাস্তা ও পরিবেশে হ্যালোউইন উদযাপন করতে একেবারে পল্লি এলাকায় নিয়ে চলল। হাতের বামে চমৎকার সুউচ্চ পাহাড় আর ডানে সান ফ্রান্সিসকো উপসাগরের মনোরম জলধারার মাঝখান দিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম। 
পথের দুপাশে ভুট্টার সবুজ ক্ষেত। ক্ষেতের চতুর্দিক নানান বর্ণের বাহারি ফুলের উপস্থিতি যেন এক ঐন্দ্রজালিক রূপের পার্থিব স্বর্গের বুনন রচনা করেছে।
গাড়ি থামিয়ে সেই পল্লবিত সবুজের, বর্ণিল পুষ্পধামের পাশে দাঁড়ালাম। সম্মুখে প্রকৃতির প্রাচীর হয়ে শুয়ে থাকা পাহাড়ের ওপর গোধূলির হেলে পড়া সূর্যের ফালি ফালি কোমল রোদ। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ প্রাণের আরতি সেখানে উদ্ভাসিত হলো।
advertisement image

Leave Your Comments

Trending News