গল্পকার সফল ঠিক তখন, যখন পাঠককে কথার জাদুতে বশ করে রাখতে পারেন। একটি কাহিনির সমাপ্তি কীভাবে ঘটবে? কোন চরিত্রের কী পরিণতি হতে চলেছে? এই প্রশ্নগুলো পাঠকমনে তুলে আনতে পারলেই লেখা অনেকটা সার্থক হয়ে ওঠে। এদিক থেকে কথাসাহিত্যিক মিলটন হোসেন সাফল্যের দাবিদার হতে পারেন তাঁর ‘আইল অব সিরেনিটি’ উপন্যাসের জন্য। এই নিউরো-সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার কাহিনি শুরু থেকে পাঠকমনে কৌতূহল জাগিয়ে তোলে। একেকটি অধ্যায় অতিক্রমের মধ্য দিয়ে কাহিনির গভীরে প্রবেশের মুহূর্তগুলো সত্যিকার অর্থে রোমাঞ্চকর। এর প্রধান কারণ পাঠক শুরুতেই জানতে পারছেন, জেনকি ইয়াকির নামের এক ব্যক্তি ৮৮ বছর বয়সেও এক নিষিদ্ধ দ্বীপে অভিযানে যাচ্ছেন। জেনকি ইয়াকির হলেন সেই প্রজ্ঞাময় নারীদের একজন, যিনি কোষ বিজ্ঞানের প্রতিটি পরতে রেখে গেছেন প্রতিভার ছাপ। জাপানের রিকেন ব্রেন সায়েন্স ইনস্টিটিউটের একজন বিশিষ্ট নিউরোসায়েন্স গবেষক তিনি। বয়সের ভারে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে দুরারোগ্য নিউরোডিজেনারেটিভ ডিসঅর্ডারের কারণে। অথচ তাঁর মানসিক শক্তি প্রবল ঝড়েও অটল থাকা দাঁড়ের মতো। এমনই একজন নারী যখন নৌকাযোগে বেরিয়ে পড়ছেন পাপুয়া নিউগিনির এক রহস্যময় নিষিদ্ধ দ্বীপে, তখন তা জেনে পাঠকমনে কৌতূহলের জন্ম নেবে এটাই স্বাভাবিক। তবে পাঠকের সেই কৌতূহল ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলতে গল্পে বুনন যেমন হওয়া চাই, ঠিক সেটাই উপস্থাপনের চেষ্টা করে গেছেন লেখক মিলটন হোসেন। সহজ ও সাবলীল ভাষায় কাহিনি বিন্যাসে বইটি সুখপাঠ্য হয়ে উঠেছে–এ কথা স্বীকার করতেই হয়। ‘আইল অব সিরেনিটি’ উপন্যাসে আমরা যখন প্রবেশ করি, তখন জেনকির উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় আমাদের কাছে। কিন্তু অনুধাবন করা সম্ভব হয় না, নিষিদ্ধ দ্বীপ যাত্রায় কোন প্রতীক‚ লতার মুখোমুখি হতে পারেন তিনি। মূলত অজানা এই ভবিষ্যৎই কাহিনির ভেতরে প্রবেশ করার আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে। বিশেষ করে বিজ্ঞানের এক জটিল গবেষণায়রত বৃদ্ধ নারীর অভিযানও চমকপ্রদ মনে হয় সহজ ভাষায় বর্ণনার কারণে। যেমন আমরা যখন উপন্যাসের সেই অংশে উপস্থিত হই, যখন গাইড কিওশিকে নিয়ে নিষিদ্ধ দ্বীপের পথে যাত্রা করার জন্য প্রস্তুত জেনকি। কাহিনি বিন্যাস অনেকটা এ রকম– ‘অবশেষে নিষিদ্ধ দ্বীপের রহস্য উন্মোচনের পথে যাত্রার সেই দিনটি উপস্থিত হলো। আয়ার সহায়তায় বৃদ্ধাশ্রম থেকে উন্নত চিকিৎসার কথা বলে ছাড় নিল জেনকি। মাঝিরা নৌকায় জেনকিদের সব মালামাল তুলতে সহায়তা করল। চলাচলে অক্ষম হওয়ায় জেনকিকে হুইলচেয়ারে করেই নৌকায় ওঠাতে হলো।’ এই যে অংশটুকু মনের পর্দায় একটি দৃশ্যপট তুলে ধরল, তা ক্রমাগত কৌতূহল বাড়িয়ে দিল ভ্রমণ-পরবর্তী মুহূর্তকে জানার। এরপর আমরা যখন গল্পের বয়ান অনুসারে মনের পর্দায় ভেসে উঠতে দেখি, কীভাবে তারা গার্ডদের ফাঁকি দিয়ে দ্বীপের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া, ড্রোন দিয়ে দ্বীপের ভেতর দেখা এবং সেখানে সর্পিলাকার নদীর কাছাকাছি সবুজাভাব মহামূল্যবান মূর্তি দেখতে পাওয়া ঘটনাগুলো। এরপর মাঝিদের লোভ এবং হীরকখণ্ড দিয়ে তৈরি সেই মূর্তির চোখ চুরি করতে তাদের প্রাণহানির ঘটনাও এক ভয়জাগানিয়া অনুভূতি এনে দেয়। এরপর দ্বীপের অদ্ভুত বাসিন্দারা জেনকিকে তুলে নিয়ে যায়, তখন থেকে বাঁকবদল ঘটতে শুরু করে কাহিনির। রহস্য উন্মোচনের প্রতিটি অধ্যায় হয়ে উঠে আরও রোমাঞ্চকর। মুদ্রণ ও অঙ্গসজ্জা আরো ভালো করে তোলার সুযোগ প্রকাশক উপেক্ষা করেছেন মনে হলো।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more