ভোট পেতে প্রার্থীদের পাহাড় সমান প্রতিশ্রুতি

Date: 2026-02-02
news-banner

ধানের শীষে ভোট দিলে চট্টগ্রাম হবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যকেন্দ্র। দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া হবে সিঙ্গাপুর। বিএনপি ক্ষমতায় এলে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া হবে ২৫ কেজি চাল, পাঁচ কেজি আলুসহ অনেক কিছু। চট্টগ্রামকে সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে যেতে দেবে না জাতীয় নাগরিক পার্টি। এমন নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা। তবে প্রার্থীদের ‘পাহাড় সমান’ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কার কথা বলছেন ভোটাররা। 

বিভিন্ন দলের ১১৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৬টি আসনে। এর মধ্যে জামায়াত জোট কয়েকটি আসন ছেড়ে দিলেও প্রতিটি আসনেই প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। প্রার্থীদের পক্ষে মাঠে নেমেছেন তাদের স্ত্রী, ছেলে, মেয়েরাও। 

চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী শত শত নেতাকর্মী নিয়ে প্রতিদিনই ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন সাবেক এই মন্ত্রী। ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় এলে চট্টগ্রাম বন্দর ও সমুদ্র অঞ্চলকে আন্তর্জাতিক ট্রেডিং পোর্টে রূপান্তর করা হবে। শাহ আমানত বিমানবন্দর ব্যবসা-বাণিজ্যের হাব হিসেবে গড়ে উঠবে। চট্টগ্রাম হবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যকেন্দ্র। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নানা পরিকল্পনা নেওয়া হবে।’ প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় পিছিয়ে নেই একই আসনে জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ শফিউল আলমও। সাবেক এই কাউন্সিলর ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, ‘নগরের গুরুত্বপূর্ণ এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। এলাকার মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে দুই দশকে কিছুই করা হয়নি। দাঁড়িপাল্লাকে ভোট দিলে পুরো এলাকার চেহারা পাল্টে দেব। এলাকা থেকে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, খুনি, চোর, ছিনতাইকারী নির্মূল করে আধুনিক বন্দর-পতেঙ্গা গড়ে তুলব।’ বিএনপি প্রার্থী আমীর খসরুর ছেলে ইসরাফিল খসরু বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় এলে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতি পরিবারকে ২৫ কেজি চাল, পাঁচ কেজি আলু, এক কেজি মসুর ডাল, দুই লিটার ভোজ্যতেল আর এক কেজি লবণ দেওয়া হবে।’

নগর জামায়াতের সাবেক আমির ও চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচিত হলে সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে সাতকানিয়া ও লোহাগাড়াকে সিঙ্গাপুরের মতো সাজানো হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যুবসমাজকে নৈতিক ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় ভোটাররা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিতে মুখিয়ে আছেন।’ 

চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের ধানের শীষের প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী বলেন, ‘সীতাকুণ্ড তথা চট্টগ্রামের উন্নয়নের হাব হতে পারে সলিমপুর। সলিমপুর-ভাটিয়ারীকে ঘিরে নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে উন্নয়ন সমৃদ্ধির স্বর্ণ দুয়ার হবে এই জনপদ। এ জন্য যা প্রয়োজন, তা করব আমি।’ 
চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনের জামায়াত প্রার্থী ডা. একেএম ফজলুল হক বলেন, ‘নির্বাচিত হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে নীতিনির্ধারিণী পর্যায়ে ভূমিকা রাখব।’ 

চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং, হালিশহর ও পাঁচলাইশ) আসনের দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী বলেন, ‘এলাকার নাগরিক সমস্যা, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করব। এ আসনকে একটি আদর্শ ও মডেল আসনে রূপান্তর করা হবে।’ 
চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনে এনসিপির প্রার্থী জোবাইরুল আরিফ বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের আমলে দুর্নীতি ছাড়া এলাকায় কিছুই হয়নি। আসনের অনেক এলাকায় সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে বাসিন্দারা অতিষ্ঠ। এনসিপি নির্বাচিত হলে সন্ত্রাসীদের কঠোর হাতে নির্মূল করা হবে। মানুষের নিরাপত্তা ও শাসন ব্যবস্থা ফেরাতে যা প্রয়োজন, সবই করব।’ নির্বাচিত হলে এলাকাকে যানজটমুক্ত, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত, নান্দনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলা, উন্নত সমৃদ্ধ হিসেবে গড়ে তোলার মতো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন অন্য প্রার্থীরাও।

তবে এসব প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে বন্দর-পতেঙ্গা আসনের ষাটোর্ধ্ব ভোটার মো. ইসহাক বলেন, ‘৩০ বছর ধরে পরিবার নিয়ে এলাকায় বসবাস করছি। বিগত সময়ে একই ব্যক্তি একাধিকবার এখানে নির্বাচিত হলেও এলাকার আশানুরূপ উন্নয়ন হয়নি। এখনও চুরি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি রয়ে গেছে। এবারের প্রার্থীরাও নির্বাচিত হলে সব সমস্যার সমাধান করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বাস্তবে তা দৃশ্যমান হওয়া নিয়ে আমার মতো বেশির ভাগ ভোটারই সন্দিহান।’ সাতকানিয়ার বাসিন্দা আলী আকবর বলেন, ‘অবাস্তব নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট আদায়ের চেষ্টা করছেন বেশির ভাগ প্রার্থী। অতীতের খারাপ অভিজ্ঞতা থেকে এবার ভোটাররা অনেক ভাবনাচিন্তা করেই ভোট দেবেন। এখন ভোটাররা অনেক বেশি সচেতন।’ বাকলিয়ার ভোটার ইসরাত বেগম বলেন, ‘অতীতে প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট আদায় করেছেন। অথচ ক্ষমতায় এসে এলাকার উন্নয়নের চেয়ে নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত ছিলেন তারা। তাই এবার কাকে ভোট দেবেন–তা নিয়ে সন্দিহান ভোটাররা।’
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. বেলায়েত হোসেন চৌধুরী বলেন, প্রচারণা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত বড় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি। শেষ পর্যন্ত প্রার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রচারণা চালাবেন বলে তাদের প্রত্যাশা। ১৬টি আসনে এবার ভোটার ৬৬ লাখ ৮৫ হাজার ১২৫।

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News