ইশতেহারে নিরাপদ সড়কের দাবি আছে তো?
Date: 2026-02-02
বাংলাদেশে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি ও অগ্রগতির গল্প যতই শোনা যাক; সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান সেসব অর্জনের ওপর প্রতিদিন এঁকে দেয় নির্মম প্রশ্ন চিহ্ন। উন্নয়ন যদি মানুষের জীবনকে নিরাপদ না করে, তবে সে উন্নয়ন কতটা অর্থবহ? প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ ঝরছে। কেউ স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে; পরিবারগুলো মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতা দীর্ঘদিনের নীতি-ব্যর্থতা ও অবহেলার ফল।
বিভিন্ন গবেষণা ও বেসরকারি সংস্থার তথ্যে দেখা যায়, প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় এবং আহত হয় তার কয়েক গুণ। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই ক্ষতি ভয়াবহ। অথচ এত বড় একটি সংকট এখনও রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় দৃশ্যমানভাবে জায়গা পায়নি।
এই প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়; এটি রাষ্ট্রের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধনের এক ঐতিহাসিক সুযোগ। কিন্তু দুঃখজনক, অতীতের অধিকাংশ ইশতেহারে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি হয় উপেক্ষিত, নয়তো অত্যন্ত সাধারণ ও অস্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। ফলাফল হিসেবে সরকার পরিবর্তন হলেও সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামেনি।
একজন নাগরিক নিরাপদে ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে– এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব যদি রাষ্ট্র পালন করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, নৈতিক ব্যর্থতাও বটে।
প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে সড়ক নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করা জরুরি। এটি কোনো ছিটেফোঁটা প্রতিশ্রুতি হিসেবে নয়, বরং আলাদা ও স্পষ্ট অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। একই সঙ্গে একটি ‘১০ বছর মেয়াদি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা রোডম্যাপ’ প্রণয়নের অঙ্গীকার থাকতে হবে, যেখানে দুর্ঘটনা কমানোর নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা, সময়সীমা ও দায়বদ্ধ সংস্থাগুলোর ভূমিকা নির্ধারিত থাকবে।
বাংলাদেশের পরিবহন খাত দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর দখলে। রুট পারমিট থেকে শুরু করে শ্রমিক ইউনিয়ন ও মালিক সমিতি পর্যন্ত সর্বত্র ক্ষমতার ছায়া থাকায় আইনের সঠিক প্রয়োগ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও এই অদৃশ্য চাপের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। তাই ইশতেহারে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা চাই– পরিবহন খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং এখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে।
চালক প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থার দুর্বলতা সড়ক দুর্ঘটনার বিশেষ কারণ। আজও দেশের সড়কে অসংখ্য চালক চলাচল করছে, যাদের নেই মানসম্মত প্রশিক্ষণ ও বৈধ লাইসেন্স। আধুনিক ড্রাইভিং ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন, সম্পূর্ণ ডিজিটাল লাইসেন্সিং ও ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা চালু এবং পেশাদার চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক রিফ্রেশার কোর্স চালুর অঙ্গীকার ছাড়া সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব।
একইভাবে ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়কের নীরব ঘাতক হিসেবে কাজ করছে। যান্ত্রিক ত্রুটি, ব্রেক ফেল, টায়ার বিস্ফোরণ দুর্ঘটনার বড় কারণ। অথচ যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষার প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নবিদ্ধ। তাই যানবাহন পরীক্ষা ব্যবস্থা শতভাগ ডিজিটাল, স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং নির্দিষ্ট বয়স অতিক্রম করা যানবাহন ধাপে ধাপে নিষ্ক্রিয়করণের প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত হওয়া জরুরি।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পরও অনেক ক্ষেত্রে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পার পেয়ে যায়। ফলে বেপরোয়া আচরণ কমে না। এ জন্য ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ বাস্তবায়নে বিশেষ সড়ক দুর্ঘটনায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের অঙ্গীকার ইশতেহারে থাকা প্রয়োজন। দুর্ঘটনা-পরবর্তী সময়, বিশেষ করে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ প্রাণ রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ মহাসড়কে দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ঘাটতি প্রকট। ইশতেহারে মহাসড়কে দ্রুত রেসপন্স টিম, জেলা পর্যায়ে ট্রমা সেন্টার এবং একটি রিয়েল-টাইম জাতীয় সড়ক দুর্ঘটনা তথ্য ব্যবস্থা চালুর অঙ্গীকার থাকতে হবে।
দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক ও নগর এলাকায় বহু ঝুঁকিপূর্ণ স্থান বা ‘ব্ল্যাক স্পট’ চিহ্নিত থাকলেও তা নির্মূলে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না। ইশতেহারে ব্ল্যাক স্পট নির্মূলে আলাদা বাজেট বরাদ্দ, নিরাপদ ফুটপাত, ওভারপাস, আন্ডারপাস ও জেব্রা ক্রসিং বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। রুট র্যাশনালাইজেশন, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং নারী-শিশু-প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করা সামাজিক ন্যায়বিচারের অংশ। এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়; রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এস এম আজাদ হোসেন: মহাসচিব,
নিরাপদ সড়ক চাই

