যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা না অচলাবস্থা, কোন পথে ইরান?

Date: 2026-01-26
news-banner

ইরানে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ-সহিংসতা আপাতত থেমে গেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযানে হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন, অনেকের ব্যবসা–প্রতিষ্ঠান জব্দ করা হয়েছে এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত থাকার অভিযোগে ‘সন্ত্রাসবাদ’ মামলাও হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই আপাত শান্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর সংকট, যা আবারও বড় ধরনের অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে।

গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর, রাজধানী তেহরানের কয়েকটি বাজারে অর্থনৈতিক সংকটের জেরে ছোট ছোট বিক্ষোভ থেকে ইরানে বড় বিক্ষোভের শুরু হয়। মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি ও রিয়ালের দরপতনে ক্ষুব্ধ হয় দেশটির তরুণ জনগোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষ। একপর্যায়ে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। ইরানের নির্বাসিত শেষ শাহ'র ছেলে রেজা পাহলভি সরকারের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদের ডাক দিলে রাস্তা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে শত শত মানুষের মৃত্যুর খবর আসতে থাকে।

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এটিই ছিল দেশটির অন্যতম রক্তক্ষয়ী আন্দোলন। সরকারি হিসাবে, এসব ঘটনায় তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, নিহতের সংখ্যা আরও বেশি।

ইরান সরকার এই অস্থিরতা উসকে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করছে। দেশটি বলছে, তথাকথিত সন্ত্রাসীরা এই আন্দোলন দখল করেছে।

%E0%A7%AA_1769260781.jpg

অর্থনৈতিক চাপে পিষ্ট সরকার
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের আন্দোলনগুলোর মতো এবার পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ সরকারের হাতে খুবই সীমিত। ২০১৯ সালের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি বা ২০২২ সালের নারীনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের পর সরকার ভর্তুকি ও সামাজিক শিথিলতার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছিল। কিন্তু এবার অর্থনৈতিক বাস্তবতা সেই পথ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।

দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে ইরানি রিয়ালের মূল্য ভয়াবহভাবে কমে গেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশটির মুদ্রাস্ফীতি ৪২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও দীর্ঘস্থায়ী পানিসংকট, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার বাধ্যবাধকতা

অর্থনীতি ঘুরে দাঁড় করাতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা করে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা ছাড়া ইরানের সামনে কার্যত কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সে ক্ষেত্রে পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের মতো মূল নীতিতে ছাড় দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, ‘এটি কোনো টেকসই স্থিতাবস্থা নয়। পরিবর্তন ছাড়া এই পরিস্থিতি ধরে রাখা সম্ভব নয়।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন- পারমাণবিক কার্যক্রম বাড়ালে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। যদিও সম্প্রতি দাভোসে তিনি বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি জোরদার করছে, যা আলোচনায় ইরানের ওপর চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

%E0%A7%AB_1769260803.jpg

আঞ্চলিক প্রভাব ও নিরাপত্তা প্রশ্ন
ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ ইরানের আঞ্চলিক অবস্থানকেও দুর্বল করেছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের সরকারের পতন এবং ইরাকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক মূলধারায় যুক্ত হওয়া ইরানের ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’ কৌশলকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এত দিন রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে যে অলিখিত সামাজিক চুক্তি ছিল- নিরাপত্তার বিনিময়ে রাজনৈতিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা- তা ভেঙে পড়েছে। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট এবং মৌলিক সেবার ঘাটতির কারণে সেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও আর বিশ্বাসযোগ্য নয়।

পরিবর্তন কি অনিবার্য?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো ইতিমধ্যেই পরিবর্তনের পথে। ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রভাব কমে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)–নির্ভর সামরিক নেতৃত্ব শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের গবেষক হালিরেজা আজিজির ভাষায়, ‘খামেনির পর আমরা যে ইরান দেখব, তা বর্তমান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের মতো হবে না। পরিবর্তন কীভাবে আসবে- গণআন্দোলনের মাধ্যমে, নাকি নিরাপত্তা কাঠামোর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে-তা এখনো অনিশ্চিত। তবে পরিবর্তন যে অনিবার্য, তা স্পষ্ট।’ 

সূত্র: আল-জাজিরা

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News