বিএনপির ভরসা চট্টগ্রাম উত্তরে, জামায়াতের শক্তি দক্ষিণে

Date: 2026-01-24
news-banner

মনোনয়নপত্র গ্রহণের সময় প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের যে হিসাব ছিল চট্টগ্রামে; তা পাল্টে গেছে প্রতীক বরাদ্দের পর। বিএনপি চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের প্রতিটিতেই নিজেদের প্রার্থী রেখেছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী প্রথমে ৯টিতে নিজেদের প্রার্থী দিলেও পরে তা নিয়ে গেছে ১৩টিতে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট দক্ষিণ চট্টগ্রামের ৫টি আসনেই এবার বিশেষ নজর রাখছে। এই সাংগঠনিক জেলাতে নিজেদের শক্ত ভোট ব্যাংক এবং বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় বেশি আশা দেখছে জামায়াত। অন্যদিকে বিএনপির আস্থা বেশি উত্তরের সাত আসনে। সেগুলোতে বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী আছেন এবং জামায়াত কখনও বিজয়ী হয়নি।

জামায়াতে ইসলামীর ঘাঁটি বলা হয় নগরীর চকবাজার, দেওয়ানবাজার, আন্দরকিল্লা, পাঁচলাইশসহ আশপাশের এলাকাকে। এখানে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও একচ্ছত্র আধিপত্য তাদের। চট্টগ্রাম-১০ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনে অতীতে নির্বাচনে সবসময় সরব ছিলেন জামায়াতের ভোটাররা। কিন্তু শুরুর দিকে এবার ভিন্নচিত্র ছিল এই আসনে। জামায়াত নিজে নির্বাচন না করে এই আসন ছেড়ে দিয়েছিল নেজামে ইসলামীকে। এটিসহ নগরীর চারটি আসনের তিনটিই ছেড়ে দিয়েছিল তারা জোট শরিকদের। পরে সে অবস্থান পরিবর্তন করে তারা। ভোটের হিসাব বিশ্লেষণ করে জামায়াত পরে নগরের চারটি আসনের তিনটিতে তাদের প্রার্থী দেয়। বিএনপি শুরু থেকেই নগরের চারটি আসনে ভাগ দেয়নি জোটের কাউকে। নিজেদের প্রার্থী দিয়ে নগরকে জয় করার ছক কষেছে তারা 
প্রথম থেকেই।

জানতে চাইলে নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘দলের নেতৃত্বাধীন জোটে থাকা শরিকদের কেউ কেউ নগরের আসন চেয়েছিলেন। এখানে বিএনপির যে অবস্থান, তাতে ভালো সম্ভাবনা দেখছি আমরা। তাই নগরের চারটি আসনের সবক’টিতেই নির্বাচন করবেন দলের প্রার্থীরা। চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ জেলাতেও আমাদের অবস্থান শক্তিশালী। সেখানেও সবাই আমাদের নিজেদের প্রার্থী।’ দক্ষিণে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা ও অতীতে জামায়াতের বিজয়ী হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যারা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন তারা ভোটের মাঠে খুব একটা ফ্যাক্টর নন। তাদের ব্যাপারে এরই মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল।’

তবে উত্তর জেলা জামায়াতে ইসলামের আমির মুহাম্মদ আলা উদ্দীন সিকদার বলেন, ‘ভোটের মাঠে কোনটি ফ্যাক্টর আর কোনটি ফ্যাক্টর না তা আগাম বলা কঠিন। দক্ষিণে অতীতেও জামায়াত থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। সেখানে আমাদের সাংগঠনিক শক্তিও অনেক বেশি। তবে উত্তরেও এবার আশা দেখছি আমরা।’ নগরে শেষ মুহূর্তে প্রার্থী পরিবর্তন করা প্রসঙ্গে নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী বলেন, ‘দলের যারা নীতিনির্ধারক, তারা অনেক কিছু হিসাব-নিকাশ করেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’

চট্টগ্রামে ১৬টি আসনের সব ক’টিতেই প্রার্থী আছে বিএনপির। জামায়াত প্রথমে সাতটি আসন জোটকে ছেড়ে দিলেও পরে কমিয়ে এনেছে তিনটিতে। চট্টগ্রামে ১২টি আসনে লড়বেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। তারা জাতীয় নাগরিক পার্টিকে দিয়েছে একটি আসন। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে একটি ও এলডিপিকে একটি আসন ছেড়েছে তারা। 
চট্টগ্রামে বিএনপি ও জামায়াত উভয়ের সাংগঠনিক জেলা তিনটি। নগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলায় বিভক্ত হয়েই প্রধান এই দুই দল তাদের রাজনীতি পরিচালনা করছে। নগরে চারটি সংসদীয় আসন থাকলেও উত্তরে সাতটি ও দক্ষিণে আছে পাঁচটি। আগের নির্বাচনগুলোতে দক্ষিণে তুলনামূলক বেশি ভোট পেয়েছে জামায়াত। সেখানকার সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসন থেকে একাধিকবার এমপিও নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী। সর্বশেষ ছয় জাতীয় নির্বাচনে উত্তর জেলার কোনো আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হননি জামায়াতের কোনো প্রার্থী। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই উত্তর জেলাতেও নজর রাখছে তারা। সেখানকার সাতটি আসনের মধ্যে কেবল চট্টগ্রাম-৪ (হাটহাজারী) আসনই জামায়াত ছেড়ে দিয়েছে তাদের জোটে থাকা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থীকে। বাকি আসনগুলোতে নিজেদের প্রার্থী দিয়েছে তারা।

নগরীর ১৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী যারা
উত্তর চট্টগ্রামের সাতটি আসনে বিএনপি দলীয় প্রার্থীরা হচ্ছেন–চট্টগ্রাম-১ মিরসরাই আসনে নুরুল আমিন, চট্টগ্রাম-২ ফটিকছড়িতে সরোয়ার আলমগীর, চট্টগ্রাম-৩ সন্দ্বীপে মোস্তফা কামাল পাশা, চট্টগ্রাম-৪ সীতাকুণ্ডে আসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৫ হাটহাজারীতে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম-৬ রাউজান আসনে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম-৭ রাঙ্গুনিয়ায় হুম্মাম কাদের চৌধুরী। নগরীর চারটি আসনে প্রার্থী হচ্ছেন চট্টগ্রাম-৮ চান্দগাঁও-বোয়ালখালীতে এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম-৯ কোতোয়ালি-বাকলিয়ায় মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম-১০ হালিশহর-ডবলমুরিং আসনে সাঈদ আল নোমান ও চট্টগ্রাম-১১ বন্দর-পতেঙ্গায় আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দক্ষিণ চট্টগ্রামের পাঁচটি আসনে প্রার্থী হচ্ছেন যথাক্রমে মোহাম্মদ এনামুল হক, সরোয়ার জামাল নিজাম, জসিম উদ্দীন আহমেদ, নাজমুল মোস্তফা আমিন ও মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী।

চট্টগ্রামের ১২টি আসনে জামায়াতের প্রার্থী যারা
উত্তর চট্টগ্রামে জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে আছেন–মিরসরাইয়ে ছাইফুর রহমান, ফটিকছড়িতে মুহাম্মদ নুরুল আমিন, সন্দ্বীপে মুহাম্মদ আলা উদ্দীন সিকদার, সীতাকুণ্ডে মো. আনোয়ার ছিদ্দিক, রাউজানে মো. শাহাজাহান মঞ্জু, রাঙ্গুনিয়ায় এটিএম রেজাউল করিম, হালিশহর-পাহাড়তলীতে মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী, কোতোয়ালী-বাকলিয়াতে ডা. একেএম ফজলুল হক, বন্দর-পতেঙ্গাতে শফিকুল আলম, আনোয়ারায় মাহমুদুল হাসান, পটিয়াতে ডা. ফরিদুল আলম, সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় শাহজাহান চৌধুরী ও বাঁশখালীতে মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম।

জোটকে যেসব আসন ছেড়েছে জামায়াত
নগরের চারটি আসনের মধ্যে চট্টগ্রাম-৮ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন মো. আবু নাছের। এই আসনটিতে জোটের হয়ে এখন এনসিপি প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফ লড়বেন। চট্টগ্রাম-৯ আসনে এখন জামায়াতের প্রার্থী হচ্ছেন এ কে এম ফজলুল হক। আগে এ আসনে নেজামে ইসলামী পার্টির মো. নেজাম উদ্দীনকে জোটের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেছিল জামায়াত। দক্ষিণ চট্টগ্রামের পাঁচটি আসনের মধ্যে তিনটিই আগে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল জোটের শরিকদের। চট্টগ্রাম-১২ পটিয়া ও চট্টগ্রাম-১৪ চন্দনাইশ আসন দুটি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিকে (এলডিপি) ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম-১২ আসনে এম এয়াকুব আলী এবং চট্টগ্রাম-১৪ আসনে এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদের ছেলে ও দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক ওমর ফারুক জোটের হয়ে লড়বেন। চট্টগ্রাম-১৩ আসনে খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ ইমরান প্রার্থী ছিলেন। পরে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আনোয়ারায় মাহমুদুল হাসান ও পটিয়াতে ডা. ফরিদুল আলমকে চূড়ান্ত করে জামায়াত। দক্ষিণে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা ও নিজেদের আলাদা ভোট ব্যাংক থাকাতে শেষ মুহূর্তে জামায়াত এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান দলটির নীতিনির্ধারকরা। তবে বিএনপি বলছে জামায়াতের এই আশা গুড়েবালি হবে এবারও। 

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News