শুক্লাম্বর দিঘি মেলার বয়স ৪০০ বছর
Date: 2026-01-19
বিশাল দিঘি, চার পাড়ে মানুষের ঢল। ভোরের কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করে শিশু থেকে বৃদ্ধ হাজারে মানুষ দিঘির জলে পুণ্যস্নান করছেন। কেউ দিঘির জলে দুধ ঢালছেন, কেউ অশ্বত্থ গাছের ডালে রঙিন সুতো বেঁধে মানত করছেন, কেউ সিঁদুর মেখে দিচ্ছেন গাছের ডালে। চলছে নানা পূজা-অর্চনা।
ধর্মীয় আবহে মুখরিত চন্দনাইশ উপজেলার বরমা ইউনিয়নের বাইনজুড়ি গ্রামের ঐতিহ্যবাহী শুক্লাম্বর দিঘি এলাকা। প্রতিবছর ১৪ জানুয়ারি এই দিঘি কেন্দ্র করে বসে মেলা। এটি মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আয়োজন, তবে প্রতিবছর মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এটি এখন সর্বজনীন সামাজিক উৎসব।’
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি ও মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্যরা জানান, প্রায় ৪০০ বছর আগে শ্রী শুক্লাম্বর ভট্টাচার্য্য ত্রিপাঠি নামের এক সাধক ভারতের নদীয়া অঞ্চল থেকে বাইনজুড়ি গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন। তিনি নির্জন স্থানে জমি ক্রয় করে শিবমন্দির নির্মাণ করেন এবং ধর্মপ্রচার ও জনসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। পরে সেখানে একটি অশ্বত্থ গাছ রোপণ করে শক্তির আরাধনা শুরু করেন। কঠোর সাধনায় ত্রিপুরা দেবীর কৃপা লাভ করে তিনি ওই অশ্বত্থমূলেই সিদ্ধিলাভ করেন বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। এরপর তিনি সেখানে একটি বিশাল দিঘি খনন করেন, যা কালক্রমে শুক্লাম্বর দিঘি নামে পরিচিতি পায়।
সনাতনী সম্প্রদায়ের মানুষের বিশ্বাস, এই দিঘির জলে পুণ্যস্নান করলে অতীতের পাপ মোচন হয় ও মনোবাসনা পূর্ণ হয়। এই বিশ্বাস থেকেই প্রতিবছর মাঘ মাসে হাজার হাজার নারী-পুরুষ দূরদূরান্ত থেকে মানত নিয়ে শুক্লাম্বর দিঘিতে ছুটে আসেন। পুণ্যস্নান ও পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষা দেবতার কাছে নিবেদন করেন।
প্রতিবছর ১৪ জানুয়ারি দিঘি ও তৎসংলগ্ন প্রায় ১৫ একর এলাকা এবং প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কজুড়ে বিশাল মেলা হয়। দেশ-বিদেশের পুণ্যার্থী, তীর্থযাত্রী, পূজারি ও দোকানিদের আগমনে এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। ভারত, ভুটান ও নেপাল থেকেও পুণ্যার্থীরা আসেন।
সীতাকুণ্ড থেকে স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে আসা মুক্তা সেন বলেন, ‘স্বামীর শারীরিক সুস্থতা, সংসারের উন্নতি এবং সন্তানদের পড়ালেখায় ভালো করার আশায় আমি দেবতার কাছে মানত করেছিলাম। প্রায় প্রতিবছরই আমি পরিবারসহ এই মেলায় আসি ও দিঘির জলে পূণ্যস্নান করি।’ চট্টেশ্বরী থেকে আসা ১৭ বছরের কিশোরী পূর্ণিমা জানায়, মনের ইচ্ছা পূরণের আশায় সে অশ্বত্থ গাছের ডালে রঙিন সুতো বেঁধেছে। মনোবাসনা পূর্ণ হলে আবার আসবে এবং সেই সুতো খুলে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছে সে।
মেলায় নাগরদোলাসহ নানা ধরনের গ্রামীণ পণ্য ও খাদ্যসামগ্রীর সমাহার ঘটে। বেতের তৈরি ঝুড়ি, ডালা–কুলা, চালুনি, মোড়া, দা-বটি-ছোরা, যাঁতা, মাটির ঘটি-বাটি মেলে মেলায়। পাওয়া যায় শীতকালীন সবজি, বড় আকারের মানকচু, শাপলা মাছ, দেশি পুকুরের মাছ। চটপটি, খই, বাতাসা, নানা ধরনের টফি, নিমকি, নকুলদানা, গজা, কদমাসহ খাবারের দোকানে ক্রেতাদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
মেলা পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি অরূপ রতন চক্রবর্ত্তী বলেন, ‘আনুমানিক ৪০০ বছর ধরে সনাতনী সম্প্রদায়ের মহামিলন ক্ষেত্র শুক্লাম্বর দিঘি মেলা। যদিও এটি মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আয়োজন, তবে প্রতিবছর মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মেলাটি একটি সার্বজনীন সামাজিক উৎসবে রূপ নিয়েছে।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মেলা চলাকালীন পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। তাদের কঠোর নজরদারির কারণে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে এ বছরের মেলা সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন মেলা কর্তৃপক্ষ।

