আতঙ্ক থেকে স্বস্তির কান্না

Date: 2026-01-19
news-banner

“তারা আমার বুকে সেই উষ্ণ কোমল প্রাণটা তুলে দিল আর বলল, ‘আপনার মেয়ে হয়েছে’। আমার খাদিজা। ওই মুহূর্তে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।’’ কথাগুলো বলছিলেন উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দের বাসিন্দা ২৪ বছর বয়সী গুলিরানো। মেয়ের মুখ দেখার সেই আনন্দের আড়ালে গুলিরানোর মনের গভীরে ছিল এক দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস। প্রসবের আগের দিনগুলো যে তীব্র উদ্বেগ আর শঙ্কায় কেটেছিল, ওই মুহূর্তটি যেন সে সব ভয় ধুয়েমুছে দিয়েছিল।

প্রসবের আগে শেষ চেকআপের সময় তাসখন্দের ৭ নম্বর প্রসূতি কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা গুলিরানোকে হাসপাতালেই ভর্তি থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কারণ, তাঁর বিপজ্জনক মাত্রার উচ্চ রক্তচাপ ছিল। গুলিরানো বলেন, ‘বিষয়টা যে কত গুরুতর হতে পারে, তা আমি তখন পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। যখন প্রসবের ব্যথা শুরু হলো, তখন ভয়টা সত্যি হয়ে সামনে এলো। আমার রক্তচাপ আবারও বাড়তে শুরু করল। ভয়ে আমার ভেতরটা কাঁপছিল। আমি নিজের এবং আমার অনাগত সন্তানের জন্য ভীষণ ভয় পাচ্ছিলাম।’ গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতা বিশ্বজুড়ে মাতৃমৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ।
হাসপাতালে গুলিরানোকে একটি মোটরচালিত বিশেষ বিছানায় রাখা হয় এবং এমন একটি যন্ত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়, যা ক্রমাগত তাঁর গর্ভস্থ শিশুর হৃৎস্পন্দন পর্যবেক্ষণ করতে পারে। উজবেকিস্তানের এ হাসপাতালে গুলিরানোর চিকিৎসায় যে আধুনিক সরঞ্জামগুলো ব্যবহৃত হয়েছে, তা সম্প্রতি সরবরাহ করেছে জাতিসংঘের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সংস্থা ইউএনএফপিএ।
দেশটির মাতৃ ও নবজাতক সেবাব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইউএনএফপিএ এবং উজবেকিস্তানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে একটি উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর আওতায় সংস্থাটি উজবেকিস্তানের ২৩০টি প্রসূতি হাসপাতালে দুই হাজার ৩০০টিরও বেশি জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ফিটাল হার্ট মনিটর, উন্নত অপারেশন টেবিল এবং প্রসূতি সেবার অন্যান্য জরুরি ও আধুনিক সামগ্রী। প্রতিটি সরঞ্জামের সঙ্গে দুই বছরের ওয়ারেন্টি এবং যন্ত্রাংশ ও ডিসপোজেবল সামগ্রীর দুই বছরের সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। এই আধুনিকায়নের ফলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশটিতে মাতৃমৃত্যুর হার প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে কমেছে নবজাতকের মৃত্যুহারও। এমনকি মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে কম ওজনের নবজাতকদের বেঁচে থাকার হার ৫ শতাংশ বেড়েছে।

শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতিই নয়, গুলিরানোর প্রসব প্রক্রিয়া সহজ করতে পাশে ছিলেন শোয়েরা নামের একজন মিডওয়াইফ বা ধাত্রী, যিনি ইউএনএফপিএর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। গুলিরানো বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করেছি এবং আমি শোয়েরার ওপর পুরোপুরি ভরসা রেখেছি। প্রসবের পুরো সময়টাতে তিনি আমাকে নির্দেশনা দিয়েছেন।’
হঠাৎ চিকিৎসকদের মুখের অভিব্যক্তি বদলে যায়। তারা বুঝতে পারেন, গুলিরানোর ‘পোস্টপার্টাম হেমারেজ’ বা প্রসব-পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। বিশ্বজুড়ে মাতৃমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরের পরিস্থিতি বদলে গেল, সবাই তৎপর হয়ে উঠলেন। গুলিরানোকে অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়া হলো। নার্স, ধাত্রী, চিকিৎসকরা অবিশ্বাস্য দ্রুততায় কাজ শুরু করলেন।
তাঁর চিকিৎসার সুবিধার্থে বিছানাটিকে বিশেষ অবস্থানে নিয়ে আসা হলো। আধুনিক এই বিছানার কারণে তাঁকে আলাদা করে অপারেশন টেবিলে স্থানান্তরের প্রয়োজন হয়নি। গুলিরানো বলেন, ‘শোয়েরা পরে আমাকে জানান, ওই গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা মিনিটই আমার জীবন বাঁচিয়ে দিয়েছে।’
২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইউএনএফপিএ উজবেকিস্তানজুড়ে ১৮ হাজারেরও বেশি চিকিৎসক, মিডওয়াইফ এবং স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এর ফলে প্রসূতিজনিত জরুরি অবস্থা মোকাবিলা এবং জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে।
চিকিৎসকদের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে রক্তক্ষরণ বন্ধ হওয়ার পর গুলিরানো তাঁর সন্তানকে আবার কোলে নেওয়ার সুযোগ পান। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে তিনি প্রথমবারের মতো তাঁর মেয়েকে বুকের দুধ পান করান।

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News