স্ত্রীর অনুমতি ও দ্বিতীয় বিয়ের আইনি ব্যাখ্যা
Date: 2026-01-19
দ্বিতীয় বিয়ে করতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগবে না–সম্প্রতি উচ্চ আদালতের একটি রায়কে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জনমনে বিভ্রান্তি ও তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মীরা। কেউ কেউ আইন সংশোধনের জন্য উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বিবেচনা করছেন। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ বর্তমান বাস্তবতায় নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় কতটুকু কার্যকর? কিংবা বিয়ে বলবৎ থাকা অবস্থায় চাইলেই কি দ্বিতীয় বিয়ে করা যায়? অনেক ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীকে মানসিকভাবে হেনস্তা করার জন্য দ্বিতীয় বিয়ের হুমকি দেওয়া হয়–আইনের দৃষ্টিতে এটি কতটুকু যৌক্তিক? এসব আইনি জটিলতা ও নারীর অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন তিন বিশিষ্টজন। গ্রন্থনা: রিক্তা রিচি
দ্বিতীয় বিয়ের জন্য সালিশি পরিষদের অনুমোদন নিতে হয়
সুলতানা কামাল
মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব ও আইনজীবী
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কথাটি আক্ষরিক অর্থে সঠিক। কারণ, মুসলিম পারিবারিক আইনের কোথাও সরাসরি স্ত্রীর কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার কথা বলা হয়নি। আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির যদি একাধিক বিয়ের প্রয়োজন হয়, তবে তাঁকে সালিশি পরিষদের (আরবিট্রেশন কাউন্সিল) অনুমোদন নিতে হবে। সালিশি পরিষদ সবদিক বিবেচনা করে অনুমতি দিলে তবেই ওই ব্যক্তি একাধিক বিয়ে করতে পারবেন।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যে শর্তটির ওপর জোর দেওয়া হয়, তা হলো স্ত্রীর সন্তান জন্মদানে অক্ষমতা। এ ছাড়া আরও কিছু শর্ত রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, সালিশি পরিষদ স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবে এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করবে। শর্তগুলো প্রযোজ্য হলে তবেই অনুমোদনের প্রশ্ন আসবে। সালিশি পরিষদের লিখিত পূর্বানুমতি ছাড়া কেউ বিয়ে করলে এক বছরের কারাদণ্ডের বিধান আছে, কিন্তু বিয়ে বাতিল হয় না। এটি আইনের একটি বড় অ্যানোমালি (জটিলতা বা অসংগতি), যা নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বলছি।
বর্তমান আইন যথেষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ
হাসনাত কাইয়ূম
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনটি আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রয়োগযোগ্য। তবে এর প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমাজে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্তমানে আইনটি সংস্কারের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। সংস্কার সাধারণত দুই ধরনের হয়–ইতিবাচক ও নেতিবাচক। সমাজে একটি পক্ষ আইনটিকে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, অর্থাৎ নারীর অধিকার খর্ব করতে চাইছে। ইসলামের দোহাই দিয়ে পরিবারের নারী সদস্যদের ওয়ারিশ থেকে বঞ্চিত করার প্রবণতাও জোরালো হচ্ছে। সেই দিক বিবেচনায় আইনটি যদি আরও অগ্রসর নাও করা হয় এবং বর্তমানে যা আছে তাও যদি ঠিকমতো বহাল থাকে, তবুও নারীরা অনেকাংশে তাদের আইনি অধিকার পাবেন। দুঃখজনক বিষয় হলো, আইনের সঠিক বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
আমাদের দেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। এখানে কেউ কেউ তুরস্কের উদাহরণ দেন, যেখানে বহুবিয়ে নিষিদ্ধ। আমাদের দেশেও যৌক্তিক কারণ ছাড়া বহুবিয়ে কার্যত নিষিদ্ধ। দ্বিতীয় বা একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীর অনুমতি লাগবে না–বিষয়টি এতটা সহজ নয়। দ্বিতীয় বিয়ে করতে হলে বেশ কিছু কঠোর শর্ত পূরণ করতে হয়। যেমন–প্রথম স্ত্রী যদি সন্তান জন্মদানে বা শারীরিকভাবে অক্ষম হন, তবেই শর্তসাপেক্ষে স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারেন। মনে রাখতে হবে, ব্যতিক্রম কখনও উদাহরণ হতে পারে না। তাই বলা যায়, এ আইনটি যথেষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ। এর চেয়ে বেশি কড়াকড়ি আরোপ করলে অনেক সময় স্বাভাবিক দাম্পত্য ও যৌনজীবন বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আইনকে যুগোপযোগী করা দরকার
ফৌজিয়া মোসলেম
সভাপতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
মুসলিম পারিবারিক আইন (১৯৬১) অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে শাস্তির বিধান আছে। তবে বিয়ের বৈধতা বহাল থাকে। ১৯৬১ সালের প্রেক্ষাপটে হয়তো আইনটি ঠিক ছিল। আজ প্রায় ৬০-৬৫ বছর পর বর্তমান বাস্তবতায় এই আইন নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কতটুকু কার্যকর, তা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিদ্যমান আইনগুলো যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংস্কার করার সুযোগ আমাদের দেশে সীমিত। আদালতের নতুন রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা রায়ের কপি সংগ্রহ করেছি এবং তা পর্যালোচনা করছি। আইনকে যুগোপযোগী করা দরকার। সে বিষয়ে আমরা খুব দ্রুত পদক্ষেপ নেব।
এর আগে বিষয়টি নিয়ে সেভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কারণ আইনের প্রয়োগ ও চর্চা নারীদের কিছুটা হলেও সুরক্ষা দিত এবং তা নারীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করত না। বর্তমান পরিস্থিতির কারণে বিষয়টি নিয়ে আমরা নতুন করে ভাবছি। আমাদের প্যানেল আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।

