লড়াই করেই এগোতে হবে জীবনের পথ...

Date: 2026-01-19
news-banner

অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। আমেরিকান অভিনেত্রী, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও মানবতাবাদী। জাতিসংঘের বিশেষ দূত হিসেবে পৃথিবীর নানা প্রান্তের শরণার্থী শিবির ঘুরেছেন। দেখেছেন মানবেতর জীবন। আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবসে দেওয়া এক ভাষণ থেকে অনুপ্রেরণার কথা তুলে এনেছেন ইয়াসিন মাসুম

জাতিসংঘের বিশেষ দূত হিসেবে এ জীবনে বহু শরণার্থী শিবিরে আমি ঘুরেছি। শুধু শরণার্থীদের মনেই নয়, বরং নিজের মনেও বেঁচে থাকার সাহস নতুন করে সঞ্চয় করার উদ্দেশ্য ছিল এসব সফর। শরণার্থীদের সঙ্গে কাটানো সময়গুলো আমার জীবনকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছে। নিজের ও নিজ ভাইয়ের জীবন বাঁচানো আট বছর বয়সী মেয়েটি আমাকে শিখিয়েছে, সাহস কাকে বলে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত বালকটি তার ভুবনজয়ী হাসির মাধ্যমে আমাকে শিখিয়েছে, দুর্জেয় উদ্দীপনার শক্তির কথা। 

হামাগুড়ি দিয়ে আসা ছেলেটি... 
তানজানিয়া। আফ্রিকান দেশ। সেই তানজানিয়ায় তাঁবুতে এক শিশুর দেখা পেয়েছিলাম। পেছন থেকে গুলিবিদ্ধ বালকটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত। আমার সঙ্গে হাত মেলাতে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এসেছিল সে। বয়স তার পনেরোর বেশি নয়। মায়াভরা চোখ, বিস্তীর্ণ হাসিমুখ। হাত মিলিয়ে হাসির বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে দিয়েছিল ছেলেটি। পরে, সে রাতে আমি জানতে চেয়েছিলাম, কেন তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়নি, কেন দেওয়া হয়নি কোনো হুইলচেয়ার। আমাকে জানানো হলো, এই ছেলেটির পুরো পরিবার খুন হয়ে গেছে। ফলে তাকে দেখভাল করার মতো কেউ আর নেই। এমনকি আশ্রয় শিবিরেও প্রথমদিকে আশ্রয় পায়নি সে। সঙ্গে থাকা সাহায্যকর্মীটি আমাকে জানালেন, তাদের সাধ্যে যতটুকু ছিল, সব টাকা খরচ হয়ে গেছে। অবশিষ্ট আর নেই কিছু। সারা রাত ছেলেটির কথা ভাবলাম আমি; ঘুমোতে পারলাম না। ভাবলাম, আমার পক্ষে কী করা সম্ভব? মনে পড়ে গেল, শরণার্থী শিবিরে হেঁটে যাওয়ার সময়, এমন বহু মানুষের দেখা আমি পেয়েছি। পেটভর্তি ক্ষুধা আর চোখভর্তি আতঙ্ক–এমন কত যে শিশু! মায়েরা কাঁদছেন, বাবারা দিশেহারা।
 
উদাস চোখে জানালার বাইরে 
এই শিবিরে হাজার হাজার মানুষ, আর এমন অজস্র শিবির সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে রয়েছে। এ কথা ভেবে নিজেকে খুবই অসহায় মনে হলো। এ সমস্যার বিশালতার কথা ভেবে আচ্ছন্ন হয়ে রইলাম। তবে এ বেলা, আট বছর বয়সী এক বালিকারও দেখা পেলাম; যার চোখের সামনে তার পরিবারের বাকি সবাইকে মেরে ফেলা হয়েছে। সে শুধু নিজের শিশু ভাইটিকে বুকে জড়িয়ে, জঙ্গলে লুকিয়ে, প্রাণে বেঁচেছে কোনোমতে। পুরো একটি সপ্তাহ একদম একা জঙ্গলে কাটিয়ে এসেছে মেয়েটি। কলা খেয়ে বাঁচিয়েছে নিজের ও শিশু ভাইটির জীবন। তার সঙ্গে যখন দেখা হলো, সে কোনো কথা বলল না; আমি যতই তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, এই সাহসিকতার জন্য সে ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। সে কেবলই সামনে-পেছনে পায়চারী করল। এক সময় উদাস চোখে তাকিয়ে রইল জানালার বাইরে।

অসহায় মানুষের আড়ালে
এক বছর পর, সেই একই শিবিরে, আরও একবার গিয়েছিলাম। দেখা পেয়েছিলাম সেই মেয়েটির, আবার। এ বেলা তাকে খুব লাজুক মনে হলো; তবে কথা বলল একটু-আধটু। দারুণ মধুর ও মার্জিত তার মুখের ভাষা। তবে কেন আমরা এখানে এসেছি–এ ব্যাপারে মাথাব্যথা তার নেই; সে কেবলই জানতে চায় নিজের সেই ভাইটির খোঁজ। ভাইটি তখন ছিল ডাক্তারদের আশ্রয়ে; আর এই মেয়েটি নিশ্চিত হতে চেয়েছিল, ভাইটি তার ঠিক আছে কিনা। কেননা, ভাইটির জন্য এখন তো সে-ই মা। সেই ছোট্ট মেয়েটির ভেতর এত গভীর অনুভূতি ও এত শক্তি কোত্থেকে এলো, হয়তো কখনোই জানব না আমি! তবে আশ্রয় শিবিরগুলোতে ঘুরে ঘুরে এটুকু জেনে গেছি, শরণার্থীরা শুধু এ জগতের সবচেয়ে অসহায় মানুষই নয়, বরং সবচেয়ে প্রাণবন্তও বটে!
 
জীবনের পাঠ 
এসব ঘটনা বেঁচে থাকার সাহস নতুন করে সঞ্চার করে। অথচ আমরা কতো ভালো জীবনযাপন করছি। তবুও জীবনের প্রতি আমাদের রাজ্যের অভিযোগ। বলি, কেবল মনোরঞ্জনের জন্য জীবন নয়। জীবন এক কণ্টকাকীর্ণ পথ। এই পথে লড়াই করেই এগিয়ে যেতে হবে! 

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News