সড়ক নিরাপত্তায় ইশতেহারে চাই স্পষ্ট অঙ্গীকার

Date: 2026-01-19
news-banner

বিশৃঙ্খল সড়কে শৃঙ্খলা কেন আনা যায়নি– এ প্রশ্ন সামনে এলে আরেক প্রশ্নও চলে আসে– এ বিষয়ে দলগুলোর সদিচ্ছা ছিল কতটুকু। উত্তর সবার জানা। রাস্তা বন্ধ করে রাজনৈতিক কর্মসূচি, গাড়িবহর নিয়ে নেতাদের শোভাযাত্রা, ফুটপাত দখল বাণিজ্য কিংবা সড়কের ওপর হাটবাজার বসানোর মতো কাজে জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা সড়ক নিরাপত্তায় বরং বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।   

বিভিন্ন সময় নিরাপদ সড়কের দাবিতে যখন আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে তখন সরকার কিংবা রাজনৈতিক দলগুলোর সাময়িক টনক নড়ে। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নানা উদ্বেগ, উদ্যোগ ও অঙ্গীকারের কথা শুনিয়ে থাকে। সে আন্দোলন স্তিমিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা সব ভুলে যায়। অতীতে বিভিন্ন সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে নিরাপদ সড়ক বিষয়ে বিশদ না হলেও যৎসামান্য যে অঙ্গীকার করেছিল, ক্ষমতায় গিয়ে তা বাস্তবায়নে তেমন অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। তারপরও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সড়ক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিক– এ প্রত্যাশা আমাদের। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এ প্রত্যাশা করাই যায়। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিশদ পরিকল্পনা ইশতেহারের মাধ্যমে দলগুলো জাতির সামনে তুলে ধরুক। প্রার্থীরা নির্বাচনী গণসংযোগের সময় ভোটারদের কাছে তা তুলে ধরুন। তাহলে ক্ষমতায় গেলে জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতির জবাবদিহি যেমন করতে হবে, তেমনি নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যকর আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাও সহজ হবে। বাংলাদেশ বহু সংকট থেকে উত্তরণ দেখেছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণে। সড়ক নিরাপত্তাও তাতে যুক্ত হতে পারে। 

ইশতেহারে কী কী থাকা দরকার
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে জাতীয় অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন, ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে কঠোরতা, শহরাঞ্চলে যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পার্কিং ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, চালক প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, সড়ক নির্মাণে পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণের বিষয়গুলো থাকা জরুরি।

বৈশ্বিক পদক্ষেপেও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা জরুরি 
আন্তর্জাতিক পরিসরে সড়ক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নানা কার্যক্রমে বাংলাদেশের যুক্ত থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছর মরক্কোতে সড়ক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত মারাকেশ ঘোষণাপত্র দেওয়া হয়। এটি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গৃহীত একটি বিশ্বব্যাপী প্রতিশ্রুতি, যা ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং আহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে অগ্রগতি ত্বরান্বিত করবে। এই ঘোষণাপত্র বিশ্বের ১০০টি দেশের মন্ত্রীদের দ্বারা অনুমোদিত, যেখানে বাংলাদেশের শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান এবং নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-ডব্লিউএইচও রোডক্র্যাশকে প্রতিরোধযোগ্য একটি অসংক্রামক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি ৩.৬) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী রোডক্র্যাশজনিত মৃত্যু ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ জন্য এখনই দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে বাংলাদেশকে। বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ সড়ক নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য একটি অগ্রগতি, তবে তা যথেষ্ট নয়। উন্নত দেশগুলোর মতো ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ গ্রহণ করতে হবে।  

রাজনৈতিক সরকারের ভূমিকা কেমন চাই
সড়ক খাতে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে যুগোপযোগী সংস্কারের প্রত্যাশা ছিল দেশবাসীর। তবে বড় ধরনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। তাই নির্বাচিত সরকারের ওপর জনপ্রত্যাশা অনেক বেশি। সড়ক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, চালকদের প্রশিক্ষণ ও আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকার আইন কঠোরভাবে প্রয়োগে কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্স গঠন করতে পারে। 

এ কে এম ওবায়দুর রহমান: সাংবাদিক ও প্রচার সম্পাদক, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News