কেমন হতে পারে থাইল্যান্ডের এবারের নির্বাচন

Date: 2026-01-19
news-banner

থাইল্যান্ডে সাধারণ নির্বাচনে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি হবে ভোট গ্রহণ। এরইমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো পুরোদমে প্রচারণা শুরু করেছে। গত ২৫ বছরে দেশটিতে উৎসাহব্যঞ্জক কোনো নির্বাচন হয়নি। তবে এবার ভোটে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে বলে মনে করা হচ্ছে। 

সেটি অবশ্য নির্ভর করবে রক্ষণশীল দলগুলোর পক্ষে কেমন ভোট পড়ে তার উপর। অনেকেই মনে করেন, নির্বাচনে ভুমজাইথাই পার্টির বিজয়ের ধারাবাহিকতা থাকলে দেশের উন্নয়নের জন্য ভালো হবে। অন্য প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল ফেউ থাই ও পিপলস পার্টিও রয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।

ফেউ থাই পার্টিকে ২০০৫ সালের পর দুইবার নিষিদ্ধ করেন থাইল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালত। পাশাপাশি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দুইবার ক্ষমতাচ্যুত হয় দলটি। এছাড়া একাধিকবার এই পার্টি থেকে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণ করা হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা থাকসিন সিনাওয়াত্রা। তার বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা ও মেয়ে পেতংটার্ন সিনাওয়াত্রাকেও প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারণ করা হয়।

২০২০ ও ২০২৪ সালে পিপলস পার্টি ভেঙে দেওয়া হয়। নির্বাচনে যাতে প্রার্থী হতে না পারেন—সেজন্য দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে প্যান্নিকা ওয়ানিচকে আজীবন নিষিদ্ধ করা হয়। পিপলস পার্টির ৪৪ জন নেতার কেউ দীর্ঘ দিন, আবার কেউ আজীবন নিষিদ্ধের তালিকায় রয়েছেন।

আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের দিন কী ঘটতে চলেছে, তা বুঝতে হলে অতীতের নির্বাচনগুলো দেখে নেওয়া উচিত। 

দেশটির বেশিরভাগ জনগণ সামাজিক মাধ্যমের প্রতি ব্যাপকভাবে লক্ষ্য রাখেন। কারণ, সামাজিক মাধ্যম ও প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ থাইল্যান্ডের নাগরিকদের মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। দেখা গেছে- ২০০১, ২০০৫, ২০০৭, ২০১১, ২০১৯ ও ২০২৩ সালের নির্বাচনের মধ্যে মাত্র দুটি সরকার দেশ পরিচালনা ও মেয়াদ পূর্ণ করেছে।

২০০১ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ‘জাগারনট থাই রাক থাই পার্টি’ ৫০০টির মধ্যে ২৪৮টি আসন জেতে। তখন দলটির পরিকল্পনা থাই রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে দিয়েছিল। পদ্ধতিগতভাবে ক্ষমতায়ন এবং দরিদ্র জনগণের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে দলটির জনপ্রিয়তা বেড়েছিল, যা অন্য দলের ক্ষেত্রে ঘটেনি। 
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে পৃষ্ঠপোষকতার কাঠামো ভেঙে ফেলার নীতিগত পরিকল্পনার জন্য ‘থাই রাক থাই পার্টি’ ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায়। দলটি ৫০০ আসনের মধ্যে ৩৭৬টিতে জয়লাভ করে।

থাই রাক থাই এবং থাকসিনের ব্যক্তিগত ব্যাপক জনপ্রিয়তা অন্য দলগুলোর জন্য হুমকি। তবে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে থাকসিনকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এরপর থেকে থাইল্যান্ড বিপর্যয় ঘটতে থাকে। পরবর্তী দুই দশক দেশটির অর্থনীতি খারাপ হতে থাকে, এখনও চলছে এই ভঙ্গুরতা।

থাই রাক থাই পার্টির উত্তরসূরি পিপলস পাওয়ার পার্টির প্রধান পালং প্রাচাচন ২০০৭ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়লাভ করেন। অল্প সংখ্যক আসন নিয়ে সরকার গঠন করে তার দল। পরে বিক্ষোভের মুখোমুখি হন তিনি। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে পিপলস পাওয়ার পার্টি আবার ভেঙে যায়। এতে বিরোধী ডেমোক্র্যাট পার্টির জন্য সেনাসমর্থিত জোটের সরকার গঠনের পথ প্রশস্ত হয়। তবে পিপলস পাওয়ার পার্টির প্রধান পালং প্রাচাচন পুরো মেয়াদে দেশ চালান। পরের বারও দলটি নতুন দল ডেমোক্র্যাট পার্টিকে হারিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করে।

২০১১ সালের জুলাইয়ের নির্বাচনে ইংলাকের নেতৃত্বে ‘ফেউ থাই পার্টি’ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। ৫০০ আসনের মধ্যে ২৬৫টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে দলটি। সরকারে থাকাকালে ইংলাকের বিরুদ্ধে ব্যাংককে বিক্ষোভ হয়। এই বিক্ষোভ ২০১৪ সালের মে মাসের সামরিক অভ্যুত্থানের ভিত্তি তৈরি করে।

সামরিক আইন জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভ্যুত্থানের সমালোচক, বিরোধীদের গ্রেপ্তার করা হয়। মৌলিক অধিকার হরণ করে বহু নেতাকর্মীকে আটক করা হয়।

২০১৭ সালে জেনারেল প্রায়ুত চান-ও-চা’র নেতৃত্বে গঠিত সেনাসমর্থিত সরকার সংবিধান সংশোধন করে। এতে সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর করে একটি ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সামরিক বাহিনী থেকে আসা সিনেটররা প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচন করতে পারবেন- এমন কথাও বলা হয়। 

২০১৯ সালের মার্চের জরিপে দেখা যায়, প্রায়ুত নেতৃত্বাধীন রক্ষণশীল ‘পালং প্রচারথ পার্টি’ পাবে ১১৬টি ও ‘ফেউ থাই’ পাবে ১৩৬টি আসন। তৎকালীন সামরিক সরকারের সঙ্গে ‘পালং প্রচারথ পার্টি’ জোট সরকার গঠন করে। দলটির প্রধান প্রায়ুত ২০২৩ সালের মে মাসের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত দেশ শাসন করেন।

ধারণা করা হচ্ছে, এবারের নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। যদি ভূমজাইথাইয়ের দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, তবে দলটি বিতর্ক ছাড়াই জোটের নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু দলটি যদি হেরে যায়, তাহলে বিতর্ক তৈরি হতে পারে, যেমনটি গত নির্বাচনে জয়ের পর হয়েছিল। মুভ ফরোয়ার্ড পার্টিকে সরকার গঠন করতে দেওয়া হয়নি। অনুতিন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে ফেউ থাই পার্টির দুই প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। 

২০২৩ সালের মে মাসের নির্বাচনের আগে প্রচারণার সময় ‘মুভ ফরোয়ার্ড পার্টি’কে নির্বাচন করতে না দেওয়ার পরিকল্পনা হয়। কীভাবে ভোট বানচাল করা যায়, তা নিয়ে অনেক কথা হয়। তখন অনেক সংস্থা ভূমজাইথাইয়ের বিরুদ্ধে জমি দখল করার অভিযোগ করে। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের সিনেট নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ উঠলেও দলটির প্রধান অনুতিন নীরব ছিলেন।

নির্বাচনের আগে ভূমজাইথাই পার্টির নেতা অনুতিন অন্য দলের নেতাদের সঙ্গে টেলিভিশন বিতর্কে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি ভোটের জন্য অপেক্ষা করছেন। কারণ, তিনি নিশ্চিত- জয় পেলে বড় বড় নেতারা তার চারপাশে থাকবেন।

ভাষান্তর: মো. মাহমুদুল হাসান

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News