শিশুর জন্মের সাত দিনের মধ্যে থাইরয়েড পরীক্ষা করা জরুরি
Date: 2026-01-19
শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে এবং ইন্টেলিজেন্স কোশেন্ট (আইকিউ) বাড়াতে থাইরয়েড হরমোনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মানুষের গড় আইকিউ অনেক দেশের তুলনায় কম হওয়ার পেছনে হাইপোথাইরয়েডিজম ও আয়োডিনের ঘাটতির বড় ভূমিকা থাকতে পারে। এ কারণে শিশুর জন্মের প্রথম সাত দিনের মধ্যেই থাইরয়েড গ্রন্থির পরীক্ষা করা জরুরি। জন্মের পর দ্রুত চিকিৎসা শুরু না হলে শিশুর মস্তিষ্কে যে ক্ষতি হয়, তা পরে আর সংশোধন করা সম্ভব নয়।
গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে একটি হোটেলে বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির উদ্যোগে ‘জানুয়ারি ২০২৬ থাইরয়েড সচেতনতা মাস’উপলক্ষে আয়োজিত কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সভাপতি ডা. শাহজাদা সেলিম। তিনি বলেন, জানুয়ারি মাস বিশ্বব্যাপী ‘থাইরয়েড সচেতনতা মাস’হিসেবে পালিত হয়। বাংলাদেশে থাইরয়েড রোগের প্রকোপ ডায়াবেটিসের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ধারণা করা হচ্ছে, দেশের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছেন, যা সংখ্যায় প্রায় পাঁচ কোটি।
ডা. শাহজাদা সেলিম আরও বলেন, থাইরয়েড রোগ অনেক সময় নীরবে বা সাইলেন্ট অবস্থায় থাকে। তাই রোগীরা বুঝতেই পারেন না, তারা এ সমস্যায় ভুগছেন। অনেক ক্ষেত্রে অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে এসে মূল সমস্যাটি থাইরয়েডজনিত বলে শনাক্ত হয়। এ কারণে সাধারণ চিকিৎসক ও প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ জোরদার করা প্রয়োজন।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক মো. ফারুক পাঠান। তিনি বলেন, শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য থাইরয়েড হরমোন অপরিহার্য। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের শিশুদের আইকিউ তুলনামূলক কম হওয়ার পেছনে হাইপোথাইরয়েডিজম ও আয়োডিনের ঘাটতি বড় কারণ হতে পারে। তাই নবজাতকের ক্ষেত্রে জন্মের প্রথম সাত দিনের মধ্যেই থাইরয়েড স্ক্রিনিং অত্যন্ত জরুরি। মাতৃস্বাস্থ্য নিয়েও গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। অধ্যাপক ফারুক পাঠান বলেন, গর্ভধারণের আগেই নারীদের থাইরয়েড গ্রন্থির পরীক্ষা করানো উচিত। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য ঠিক না থাকলে শিশুর মেধা ও শারীরিক গঠনে অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক মা জানতেনই না যে, তারা হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত ছিলেন।
কর্মশালায় থাইরয়েড ক্যান্সার নিয়েও আলোচনা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে সব ধরনের ক্যান্সারের মধ্যে থাইরয়েড ক্যান্সার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। রোগটি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তাই নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা থাইরয়েড চিকিৎসাকে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো সরকারের অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। এতে সারাদেশে থাইরয়েড রোগীদের চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য হবে বলে তারা মনে করেন। তারা বলেন, একটি সুস্থ ও মেধাবী জাতি গড়ে তুলতে হলে থাইরয়েড সমস্যাকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। সরকার, চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সচেতনতা থাকলে এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
কর্মশালার এক্সপার্ট প্যানেলে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সাবেক সভাপতি ডা. ফারিয়া আফসানা, সাধারণ সম্পাদক ডা. এম. সাইফুদ্দিন, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল আলমসহ দেশের প্রখ্যাত হরমোন বিশেষজ্ঞরা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ডা. এহসান-উজ-জামান খান। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন ডা. সৈয়দ আজমল মাহমুদ।

