সরকার একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে

Date: 2026-01-17
news-banner

অন্তর্বর্তী সরকার আদৌ নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে কিনা– এমন প্রশ্ন তুলেছেন সিপিডির (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, গণতন্ত্র, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ‘নতুন বন্দোবস্ত’ বাস্তবায়নে কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজি, বাংলাদেশের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৬: আগামী সরকারের জন্য নাগরিক সুপারিশ’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এমন মন্তব্য করেন।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, নতুন বন্দোবস্ত নিয়ে যে প্রতিশ্রুতি, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে এর প্রত্যাশিত প্রতিফলন ঘটেনি– এ কথা রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই স্বীকার করেছে। তাঁর মতে, সংস্কারের ক্ষেত্রে উপরি কাঠামো– সংবিধান সংশোধন, শাসনতান্ত্রিক ভারসাম্য কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ পরিবর্তনের কথা বললেও সমাজের অর্থনৈতিক শক্তিগুলোকে সংগঠিত না করায় কাঠামো টেকেনি। বাংলাদেশে অতীতেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছিল, তবে তা টেকেনি। কারণ এসব পরিবর্তনের পক্ষে থাকা সামাজিক শক্তিগুলোকে সংগঠিত করা হয়নি।
নতুন বন্দোবস্তের দাবিদাররাই শেষ পর্যন্ত ‘পুরোনো বন্দোবস্তের’ অংশ হয়ে পড়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যয়বহুল নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার ফলে পুরোনো কায়েমি স্বার্থ আবারও শক্ত অবস্থান ফিরে পেয়েছে।

তাঁর ভাষায়, ব্যবসায়ীরা পালালেও, রাজনীতিবিদরা আত্মগোপনে গেলেও প্রবল আমলাতন্ত্র ফিরে এসেছে, কারণ পুরোনো বন্দোবস্তের সবচেয়ে বড় রক্ষক এই আমলাতন্ত্র। অন্তর্বর্তী সরকারই আমলাতন্ত্রের পুনরুত্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। সরকার অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেনি অভিযোগ করে তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত সরকার একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এতে সরকার নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠছে–সরকার কি নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবে?

গণমাধ্যম প্রসঙ্গ 
সংলাপে গণমাধ্যম প্রসঙ্গেও ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সমালোচনা করেন। এক প্রশ্নের উত্তরে অতীতে গঠিত মিডিয়া কমিশনের কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। যে মিডিয়া প্রতিষ্ঠান নিজের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে না, তার অন্যের কাছে স্বচ্ছতা দাবি করার নৈতিক অধিকার সীমিত। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে পেশাজীবী সংগঠনগুলো স্বাধীন ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ; ফলে সাংবাদিকদের পেশাগত স্বার্থ রক্ষা ব্যাহত হয়েছে।
তাঁর মতে, গণতন্ত্র না থাকলে এবং মালিকপক্ষ যদি লুটপাটতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ হয়, তাহলে প্রকৃত মিডিয়ার স্বাধীনতা ‘সোনার পাথরবাটি’র মতো।

১২ নীতি ঘোষণা ও ১০টি জাতীয় কর্মসূচি
সংলাপে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম তাদের নাগরিক ইশতেহারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড প্রকাশ করে। ইশতেহারে সামষ্টিক অর্থনীতি থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও গণতন্ত্র– মোট ১২টি নীতি-বিবৃতি ঘোষণা করা হয়। 
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান এবং সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান নীতি ঘোষণা ও কর্মসূচি তুলে ধরেন। 
১০টি জাতীয় কর্মসূচি হলো– সর্বজনীন ন্যূনতম আয়, শিক্ষার্থীদের স্কুল মিল প্রোগ্রাম, যুব ক্রেডিট কার্ড, জাতীয় স্বাস্থ্য কার্ড, কৃষক স্মার্ট কার্ড, শ্রমবাজার তথ্য প্ল্যাটফর্ম, শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, সমন্বিত নগর পরিবহন, সমন্বিত কর ও সম্পদ তথ্য ব্যবস্থা এবং জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি।
তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, এসব প্রস্তাব শুধু আকাঙ্ক্ষা নয়, আর্থিক সক্ষমতা ও বাস্তবায়ন ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News