অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের নতুন ব্যাখ্যা ইইউর
Date: 2026-01-15
বাংলাদেশে বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় একটি অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। তবে অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের বিষয়ে এবার ভিন্ন একটি ব্যাখ্যা হাজির করেছে ইউরোপের দেশগুলোর এই জোট। গতকাল রোববার দুপুরে রাজধানীর একটি আয়োজিত হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে নতুন ব্যাখ্যাটি তুলে ধরেন বাংলাদেশে ইইউর নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের (ইওএম) প্রধান ইয়র ইয়াবস।
সংবাদ সম্মেলনে ইয়াবস বলেন, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে জটিল। এর সঙ্গে দলের নিবন্ধনের মতো বিষয় রয়েছে। তবে নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিতে প্রভাব ফেললে বিষয়টি আমলে নেওয়া হবে।
বাংলাদেশে ইইউর নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের শুরু উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলন করে ইওএম। এতে উপমিশন প্রধান ইন্তা লাসে, পর্যবেক্ষক দলের সদস্য এবং ইইউ, জার্মানি, ইতালি, কানাডা, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্কসহ ইউরোপের দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে ইয়র ইয়াবস আসন্ন নির্বাচন স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে ভোট আয়োজন ভোটারদের মাঝে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা অটুট রাখবে।
পরে প্রশ্নোত্তর পর্বে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলতে ইইউ মিশন কী বোঝাতে চেয়েছে– জানতে চাইলে ইয়াবস বলেন, আমাদের দৃষ্টিকোণে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের সব সামাজিক দলের অন্তর্ভুক্তি, যেমন– নারী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং আঞ্চলিক দল। অংশগ্রহণমূলক বলতে আমরা বুঝিয়েছি, বিশ্বাসযোগ্য ভোটারের উপস্থিতি। এটি এ বার্তা দেবে যে, বাংলাদেশি নাগরিকরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করছে নিজ ভবিষ্যতের জন্য।
অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলতে বিগত সময়গুলোতে ইউরোপের রাষ্ট্রদূতরা রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণকে বুঝিয়ে ছিলেন। অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণমূলক ব্যাখ্যা কি ইইউ পরিবর্তন করেছে– এমন প্রশ্নে ইয়র ইয়াবস বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক বলতে সবকিছু বুঝিয়েছি, নাগরিকদের ভোট দিতে পারা এবং গণনার স্বচ্ছতা। আর অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে আমরা সবাই জানি, দলের নিবন্ধন একটি বিষয়। আমরা জানি, বিষয়টি বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে একটি জটিল বিষয়। বিশেষ করে, জাতীয় সমঝোতা ও বিচারের মতো বিষয়গুলো রয়েছে। আমরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিতে যদি এটি প্রভাব ফেলে, তবে তা আমরা আমলে নেব। আমরা এখানে নির্বাচনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে মন্তব্য করতে আসিনি, আমরা বিষয়টি নিয়ে অবগত এবং নজরে রেখেছি।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত দুটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করেছি। বাকিদের সঙ্গে বৈঠকের প্রক্রিয়া চলমান।
রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনায় কী ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছে এবং তারা নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিষয়ে কতটুকু আশ্বস্ত– জানতে চাইলে ইয়াবস বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রতি নিবেদিত। সামনে কী হয়, তা আমরা পর্যবেক্ষণ করব। কারণ ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে কোনো বিশ্বাসযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হয়নি।
নির্বাচনের আগে ও পরে সহিংসতার আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্ন করলে মিশনপ্রধান বলেন, এটি একটি সমস্যার বিষয়। আমি প্রত্যাশা করি, এটি মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের পর্যাপ্ত বাহিনী রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সক্ষমতা নিয়ে জানতে চাইলে ইয়র ইয়াবস বলেন, ইসির স্বচ্ছতা ও উন্মুক্ততার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে ধারণা হয়েছে। তবে আমরা আইনি বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণে রাখব। আমরা এখানে কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষতা পর্যবেক্ষণে এসেছি।
আগামী নির্বাচনের প্রধান চ্যালেঞ্জ কী– জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নাগরিকদের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করা।’ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে প্রশ্ন করলে ইয়র ইয়াবস বলেন, বিষয়টি অনেকভাবে খতিয়ে দেখা হবে, যেমন– দলগুলোকে গণমাধ্যমে যেতে দেওয়ার সুযোগ। এ ছাড়া প্রার্থীদের আপিল করার সুযোগসহ বিভিন্ন বিষয় এখানে রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশসহ অনেক দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটি চ্যালেঞ্জ। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে আমাদের প্রাথমিক ধারণা হচ্ছে তারা ঝুঁকির বিষয়ে সচেতন। এখানে সবচেয়ে কঠিন বিষয় হচ্ছে ভারসাম্য রক্ষা করা। বিশেষ করে, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি অবাধে সমাবেশ করতে দেওয়ার অধিকারকে রক্ষা করা। এ ভারসাম্য তারা কীভাবে রক্ষা করে, সেটি আমরা পর্যবেক্ষণ করব।
অবাধ ও মুক্ত নির্বাচনের পরিবেশ বাংলাদেশে রয়েছে কিনা– এমন প্রশ্নের উত্তরে ইয়াবস বলেন, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় একটি বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সক্ষম। এ কারণেই ইইউ বাংলাদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে এসেছে।
নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, দুটি বিষয়ে একসঙ্গে ভোট সাধারণত হয় না। আমাদের দেশ লাটভিয়ায় হয়েছে। তবে আমরা মূলত সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করব। গণভোটটি আমাদের ম্যান্ডেটের বাইরে। যেহেতু দুটি বিষয় একত্রে জড়িত, ফলে সেটিও দেখা হবে।
এয়ারবাস ক্রয় না করার বিষয়টি কি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে প্রভাব ফেলবে– উত্তরে ইইউ ইওএমের মিশনপ্রধান বলেন, আমি এখানে যে ম্যান্ডেট নিয়ে এসেছি, তা আমাকে এখানকার রাষ্ট্রদূতরা বা ইইউর এক্সটার্নাল সার্ভিস দেননি। আমার কাজ হচ্ছে এখানে ন্যায়নিষ্ঠ, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ দেওয়া। পাশাপাশি কারও কথায় প্রভাবিত না হওয়া।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তারা মনে করেন। তাই শান্তিপূর্ণভাবে, বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচনগুলো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
ইয়াবস জানান, নির্বাচনের দুই দিন পর ১৪ ফেব্রুয়ারি ইইউ ইওএম একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। আর প্রায় দুই মাস পর একটি পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তা উপস্থাপন করা হবে, যেখানে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই মিশনে ২৭টি সদস্য দেশের পাশাপাশি কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের প্রায় ২০০ পর্যবেক্ষক অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এর মধ্যে ঢাকাভিত্তিক ১১ জন বিশ্লেষক নিয়ে একটি কোর টিম, ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক, ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক, যাদের ভোটের ঠিক আগে মোতায়েন করা হবে এবং ইইউ সদস্য রাষ্ট্র ও অংশীদার দেশগুলোর কূটনৈতিক মিশনের পর্যবেক্ষকরা এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধি দলও এই মিশনে যোগ দেবে।
মিশনটি তাদের কার্যক্রম চলাকালীন নির্বাচন প্রস্তুতি, আইনগত কাঠামো ও তার বাস্তবায়ন, নির্বাচনী প্রচারণা এবং নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তিসহ বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করার লক্ষ্যে নির্বাচন প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, বিচার বিভাগ, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে। এ ছাড়া নারী, তরুণ প্রজন্ম ও ঝুঁকিতে থাকা অন্যান্য জনগোষ্ঠীসহ সবার রাজনৈতিক ও নাগরিক অংশগ্রহণের সামগ্রিক পরিসর মূল্যায়ন করা হবে। ভোটারদের সচেতন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা মূল্যায়নের জন্য ইইউ ইওএমের পৃথক গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম পর্যবেক্ষণ ইউনিট রয়েছে। সামগ্রিকভাবে ইইউ ইওএম নির্বাচনগুলো জাতীয় আইন অনুযায়ী কতটা পরিচালিত হয়েছে, পাশাপাশি বাংলাদেশ যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক নির্বাচন মানদণ্ড গ্রহণ করেছে, সেগুলোর সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা মূল্যায়ন করবে।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রতিনিধিরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইইউ বাংলাদেশে একটি বড় পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়েছেন তারা।
বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বৈঠকে নির্বাচন প্রস্তুতি, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়।
শফিকুল আলম বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনেক দেশেই নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠায় না; কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের বড় বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব রয়েছে এবং বাংলাদেশকে তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশ হিসেবে বিবেচনা করে। শেখ হাসিনার প্রায় সাড়ে ১৬ বছরের শাসনামলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একবারও বাংলাদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল পাঠায়নি।
ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, বৈঠকে আওয়ামী লীগ বা দলটির নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তবে গণভোট বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই কর্মকর্তা বলেছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ও কাঙ্ক্ষিত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রেস সচিব বলেন, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আশ্বস্ত করেছেন যে, আসন্ন নির্বাচন ও গণভোট হবে অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর।

